হাড় কাঁপানো শীত ও কুয়াশাচ্ছন্ন দিনেও হাজার হাজার বন্ধুর সমাগম। দলে দলে হাসি, আড্ডা, গল্প, সেলফি—আরো কত কী! বহুদিন পর চেনা জায়গায় প্রিয় বন্ধুকে পেয়ে আবেগে আপ্লুত অনেকে। এদের কেউ যুবক, কেউ মধ্যবয়সি, কেউ প্রবীণ। দেশে প্রথম রাজশাহী কলেজে এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে তিন প্রজন্মের দুদিনব্যাপী মিলনমেলা ভাঙল শনিবার। গত শুক্রবার এ মেলার উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পদ্মাপাড়ের রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠিত ১৮৭৩ সালে। মাঝে ১৯৯৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এইচএসসি পাঠ বন্ধ। ২০১০-১১ থেকে আবার এইচএসসির পাঠ শুরু। ১৯৪৭ সালের একমাত্র শিক্ষার্থী ডা. এস এ এ বারীসহ পরের সব প্রাক্তন শিক্ষার্থীই পেয়েছেন অ্যালামনাইয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ। দেশের কলেজে এইচএসসির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অ্যালামনাই এটাই প্রথম বলে জানা যায়। এতে অংশ নিয়েছেন তিন প্রজন্মের ৯ হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী। গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও বৃহস্পতিবার রাতেই উত্সব শুরু হয় ক্যাম্পাসে। ঐ বিকাল থেকেই কলেজে আসতে শুরু করেন দেশ-বিদেশ থেকে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কেউ স্ত্রীকে নিয়ে, কেউ স্বামীকে, কেউ সন্তান এবং কেউ নাতি-নাতনিদের নিয়ে। কলেজে মেতে ওঠেন কলেজ জীবনের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়।
১৯৪৭ ব্যাচের একমাত্র শিক্ষার্থী ডা. এস এ এ বারী রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে। স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৩৭-১৩৮ রোল, আমার খুব মনে পড়ে। এই রোল নম্বরে জমজ দুই বোন ছিল। নাম মনে পড়ে না। তবে মনে পড়ে রোল নাম্বারগুলো। তারা রাজশাহী বিবি হিন্দু অ্যাকাডেমির প্রধান শিক্ষকের মেয়ে। গণেশ বাবু বলে এক শিক্ষক ফিজিক্স পড়াতেন। তিনি ক্লাসে সবার রোল ডাকতেন। কিন্তু ঐ দুই জমজ বোনের রোল বলতেন না। তাদের হাজিরা খাতায় ‘পি’ লিখে দিতেন। মজার বিষয় একদিন কোনো কারণে এক বোন আসেনি। স্যার সবার রোল ডাকার পরে থেমে গেলেন। স্যার জমজ বোনের একজনকে বললেন, এই তোমাদের মধ্যে কে আসেনি, বলো। আমরা সবাই হাসাহাসি শুরু করে দিলাম স্যারের এই কথা শুনে। যতদূর মনে পড়ে নিলিমা নামের এক ছাত্রীর কথা। বায়োলজি ক্লাসে একটাই মেয়ে। সে বসত ক্লাসের শেষ বেঞ্চে। একদম কোনায়। তেমন কারো সঙ্গে মিশত না। তাকেও নিয়ে অনেক হাসাহাসি হতো। বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা ছিল না। একদিন ক্লাসে হঠাত্ কে যেন বলল অনুষ্ঠানের কথা। তার একটু পরে ক্যাম্পাসের ফ্লালার ভবনের একটু দূরে মাঠে খালি গলায় গান গেয়েছিল একটি মেয়ে। এত সুন্দর গেয়েছিল যা আজো মনে গেঁথে আছে। ১৯৫৫ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আনোয়ার কবীর। তার ছেলে আহসান কবীর ১৯৮০ ব্যাচের শিক্ষার্থী। আর আহসান কবীরের মেয়ে মৌসুমি কবীর ২০১৩ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। সবাই এসেছিলেন অ্যালামনাই অনুষ্ঠানে। আহসান কবীর বলেন, আমরা তিন প্রজন্মই এসেছি। এর অনুভূতি যে কত ভালো তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
ইংরেজ প্রকৌশলীর পরিকল্পনায় নির্মিত পুরোনো গাঢ় লাল রঙের ভবনগুলো এমনিতেই কলেজের বিশেষ আকর্ষণ। সেসব ভবনের ওপর করা হয়েছে সাদা রঙের আলোকসজ্জা। এই আলোকসজ্জা ভবনগুলোর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। শুধু প্রশাসন ভবন নয়, কলেজের অন্য সব ভবনে করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা। বাদ যায়নি কলেজের ভেতরে থাকা গাছগুলোও।
প্রশাসন ভবনের আদলে মাঠে তৈরি করা হয়েছে বিশালাকার এক মঞ্চ। কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রখ্যাত কবি, গীতিকার এবং সুরকার রজনীকান্ত সেনের নামে মঞ্চের নাম দেয়া হয়েছে ‘রজনীকান্ত মঞ্চ’। দুদিন ধরে এ মঞ্চে থাকছে আলোচনা, স্মৃতিচারণ, ছাত্রাবাসের স্মৃতিচারণ, সাংষ্কৃতিক সন্ধ্যা, আতসবাজিসহ নানা আয়োজন। শুক্রবার রাতে মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন ব্যান্ড তারকা জেমস। শনিবার রাতে মঞ্চ মাতায় জনপ্রিয় ব্যান্ড দল চিরকুট।