নওগাঁর রাণীনগরের আতাইকুলা গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী একমাত্র ঐতিহাসিক বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হলেও আজও সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণসহ আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। এই বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য গত ২০১৫ দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আজও বাস্তবায়ন না করায় হতাশ শহিদ পরিবার ও স্থানীয়রা।
পাকহানাদার বাহিনীর হাতে নিহত ৫২ জন শহিদের পরিবার এখনো পায়নি রাষ্ট্রীয় সম্মান। বধ্যভূমিটি শহিদ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে কোনো রকমে ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে মাত্র। শহিদদের স্মৃতি রক্ষার্থে এলাকাবাসীদেরও দাবি-শহিদ পরিবারের এই বধ্যভূমির স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের।
ঐদিনের নারকীয় ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে যাওয়া আতাইকুলা গ্রামের প্রদ্যুত চন্দ্র পাল, সাধন চন্দ্র পাল ও নিখিল চন্দ্র পাল ঐদিনের করুণ হত্যাযজ্ঞের কাহিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল রোজ রবিবার সকাল ১০টায় ছোটো যমুনা নদী পার হয়ে আসে একদল হানাদার পাকবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে আছে বলে তারা সন্দেহ করে প্রথমে গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে। প্রতিটি বাড়ি থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ বাড়ির নারী-পুরুষকে ধরে নিয়ে ঐ গ্রামের যোগেন্দ্রনাথ চন্দ্রের বাড়ির উঠানে নিয়ে যায়। সেখানে পুরুষদের উঠানে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাখে আর উঠানের পাশেই নারীদের এক ঘরে রাখে। একের পর এক নারীদের ওপরে চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরে সারিবদ্ধ পুরুষদের ওপরে চলে ব্রাশ ফায়ার। মুহূর্তের মধ্যেই ঐ গ্রামের ৬৮ জনের মধ্যে ৫২ জন শহিদ হন। পরে তারা বিভিন্ন বাড়িতে লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করে চলে যায়। শহিদদের মধ্য থেকে গুলিবিদ্ধ হয়েও কোনোরকমে বেঁচে যায় প্রদ্যুত পাল, সাধন পাল ও নিখিল পাল।
প্রদ্যুত পাল আরো জানান, ঐদিন তার বাবা, কাকা, জ্যাঠা এবং গ্রামের লোকজনের সঙ্গে তাকেও সারিবদ্ধ করে চালায় ব্রাশফায়ার। মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারায় ৫২ জন লোক। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর রক্তাক্ত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লাশের মধ্য থেকে কোনোরকমে বেঁচে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সে তার বাড়িতে যায়। সবাইকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়েছি। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হলেও কোনো সরকারের আমলে কোনো শহিদ পরিবার এখনো কোনো সাহায্য-সহায়তা পায়নি। কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি ও সংরক্ষণ করা হয়নি এই বধ্যভূমি।
সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন মনোয়ারা হক গত ১৯৯৬ সালে নিজ উদ্যোগে কিছু অনুদান দিয়ে কোনোরকমে ফলকে শহিদদের নাম লিপিবদ্ধ করলেও আর কোনো কাজ হয়নি এখানে। বধ্যভূমিটি পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়।