সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কথা শোনা যাচ্ছিল বেশ কিছুকাল ধরেই। তখন থেকেই জল্পনা ছিল কে পেতে যাচ্ছেন মনোনয়ন। হঠাত্ করেই সম্প্রতি গুঞ্জণ শোনা গেল শেখ ফজলে নূর তাপসের নাম। তিনিই মনোনয়ন পেলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, এই মনোনয়নের মধ্য দিয়ে শেখ মনি পরিবারের প্রভাব রাজনীতিতে আরো একধাপ এগোলো। অর্থাত্, শেখ মনির পরিবার এখন রাজনীতিতে দ্বিতীয় প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
অবশ্য শুধু বাংলাদেশ নয়, বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন পরিবারের এমন প্রভাব রয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে যেমন বুশ পরিবারের প্রভাব রয়েছে, তেমনি আছে কেনেডি পরিবারের প্রভাবও। শ্রীলঙ্কায় পূর্বে ছিল বন্দনায়েকে পরিবারের প্রভাব। বর্তমানে রয়েছে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব। ভারতের রাজনীতিতে নেহরু পরিবারের প্রভাব সব সময় ছিল, আছে এবং থাকবে বলেই মনে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের প্রভাব সব সময়ই বেশি ছিল, সেটা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক। এই পরিবার বাংলাদেশের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত বহুকাল ধরে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট মর্মান্তিক ঘটনার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ ঘটে জিয়াউর রহমানের। জিয়া পরিবারের একটা প্রভাব নব্বয়েইর দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়। যদিও ওয়ান ইলেভেনের পর থেকেই জিয়া পরিবারের প্রভাব কমতে শুরু করে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের প্রভাব প্রায় নিঃশেষিত হয়ে গেছে। বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার, তার বড়ো ছেলে তারেক জিয়ার বিদেশে পালিয়ে বেড়ানো এবং ছোটো ছেলে কোকোর মৃত্যু জিয়া পরিবারের প্রভাব রাজনীতিতে সংকুচিত করেছে।
বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রধান বাহক শেখ হাসিনা এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম তিনি। যদিও বঙ্গবন্ধু পরিবারে তিনি ছাড়া ছোটো বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কেউই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের প্রভাব রয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো বঙ্গবন্ধুর পরিবার।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাইরেও আওয়ামী লীগে অনেকগুলো পরিবারের বিভিন্ন সময়ে প্রভাব ছিল। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী বৃত্ত তৈরি করেছিল এবং জোহরা তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একজন নেতা ছিলেন। তাঁর ছেলে সোহেল তাজ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এলেও তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। এখন তাজউদ্দীনের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি একজন এমপি হলেও এই পরিবার জাতীয় রাজনীতি তো নয়ই, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও তেমন প্রভাব বিস্তার করে না। বঙ্গবন্ধুর ভাইয়ের ছেলে শেখ হেলাল পরিবারের প্রভাব এখনো রাজনীতিতে রয়েছে। শেখ হেলাল ছাড়াও তাঁর ছোটো ভাই আওয়ামী লীগের টিকিটে এবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর ছেলে শেখ তন্ময়ও আওয়ামী লীগের টিকিটে একজন নির্বাচিত এমপি। তারপরও এই পরিবারের তেমন প্রভাব নেই। বঙ্গবন্ধু পরিবারের বৃত্তেই এই পরিবারগুলোর রাজনীতি সীমাবদ্ধ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
শেখ মনি দূরদর্শি ছিলেন। বাংলার বাণী পত্রিকার মধ্য দিয়ে তিনি মেধা চর্চার একটা ধারাও শুরু করেতে পেরেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার সঙ্গেই শেখ ফজলুল হক মনি শহিদ হন। এরপর পরিবারের হাল ধরেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পরে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকের অবস্থান থেকে তার কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয় বলে অনেকে মনে করতেন। আর তিন দফায় সরকার ক্ষমতায় এলেও একবারও তিনি মন্ত্রিত্ব পাননি। তবে এটা স্বীকার করতেই হয় যে শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় হলেও তার নিজস্ব কিছু চিন্তা ছিল। তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেকটা বাম ঘেঁষা রাজনীতির আদলে তিনি তার আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন।
সম্প্রতি যুবলীগের কংগ্রেসে শেখ মনির পুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এবার শেখ ফজলে নূর তাপস আওয়ামী লীগের টিকিট পেলেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য। অন্যদিকে শেখ সেলিমের ছেলে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআইয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সুতরাং বলাই যায় যে আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধু পরিবারের পরই আবার শেখ মনির পরিবারের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাপসের মনোনয়নের মধ্য দিয়ে শেখ মনির পরিবারের আরেকটি স্বীকৃতি মিলল।
n লেখক :সাংবাদিক