বিনিয়োগ স্থবিরতায়ও বেড়েছে ব্যাংকের মুনাফা

সরকারি ঋণের আধিক্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতার পরও গেল বছর ব্যাংক ব্যবসায় ভাল মুনাফা হয়েছে। বছর জুড়েই সিঙ্গেল ডিজিটে সুদহার নামানোর বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও কার্যত ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণেই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। রেমিট্যান্স আহরণের অবস্থা ভাল হলেও আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে গতবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে আশানুরুপ আয় করতে পারেনি ব্যাংকগুলো।

বিভিন্ন ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে পরিচালন মুনাফার যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ব্যাংকেরই মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রাথমিক হিসাব ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী গেল বছরে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো ভাল মুনাফা করেছে। এরপর রয়েছে অন্যান্য বেসকারি ও বিদেশী খাতের ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোও আগের বছরের চেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করেছে বলে ব্যাংকগুলো নিশ্চিত করেছে।

এদিকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষ্যে সাপ্তাহিক ছুটি ও ব্যাংক ক্লোজিংয়ের দিন ঢাকার সব ব্যাংকের সব শাখা খোলা থাকার কারণে হিসাবায়নে বেশ সমস্যা পোহাতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইত্তেফাককে জানিয়েছেন যে, গত শুক্রবার ও শনিবার দুইদিনে ঢাকার সব শাখা খুলে রাখলেও কোন লেনদেন হয়নি। আরেকজন এমডি জানিয়েছেন দুইদিনে মাত্র চারটি লেনদেন হয়েছে। এতগুলো শাখা কোন লেনদেন কিংবা হাতেগোনা লেনদেন হলে তা শ্রমশক্তি ও বিদ্যুতের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

যেসব ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার তথ্য পাওয়া গেছে তার মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে। ব্যাংকটি ২০১৯ সালে এক হাজার ৬০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। আগের বছরে ব্যাংকটি পরিচালন মুনাফা ছিল এক হাজার ১২ কোটি টাকা। এরপর পূবালী ব্যাংক গত বছর এক হাজার ৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। আগের বছরে ব্যাংকটি পরিচালন মুনাফা ছিল এক হাজার ১০ কোটি টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড আগের বছরে ৭৮০ কোটি টাকা আয় করলেও এ বছরে ৯০০ কোটি টাকা পরিচালনা মুনাফা করেছে।

আরও পড়ুন: উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র দাখিল

এনসিসি ব্যাংক গত বছর ৭৫৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। আগের বছরে ব্যাংকটি ৬৫৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছিল। মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগের বছরে ৬৭৩ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও গত বছরে তা বাড়িয়ে করেছে ৭৫৩ কোটি টাকা। দি সিটি ব্যাংক ২০১৯ সালে ৮২০ কোটি টাকা মুনাফা আয় করেছে। ২০১৮ সালে ব্যাংকটি ৬৬৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।

ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক গত বছরে ৮০১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। আগের বছরে এটি ছিল ৬৪০ কোটি টাকা। সোস্যাল ইসলামী ৬৮২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে ২০১৯ সালে। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬৬৭ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক গত বছরে ৭৪০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আগের বছরে মুনাফার পরিমান ছিল ৭০৫ কোটি টাকা। শাহ জালাল ইসলামী ব্যাংক ৬৫৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে ২০১৯ সালে। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৪৭৫ কোটি টাকা।

এছাড়া মেঘনা ব্যাংক গত বছরে ১২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আগের বছরে ১০৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক আগের বছরে ২০১ কোটি টাকা মুনাফা করলে গত বছরে ২৬২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এবি ব্যাংক ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে দ্বিগুণ মুনাফা করেছে। ২০১৮ সালে ৩০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা হলেও ২০১৯ সালে হয়েছে ৬০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক গত বছরে ২২৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ২০১৮ সালে ব্যাংকটি ২০৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।

এর বাইরে গত বছরে ব্যাংক এশিয়া ৯৪০ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংক ৭৩০ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ৭০০ কোটি টাকা, এনআরবি ব্যাংক ৯৩ কোটি টাকা, মধুমতি ব্যাংক ২১৮ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক ৪৩৩ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংক আগের বছরের চেয়ে কম পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। আগের বছরে যেখানে এক হাজার ২২৯ কোটি টাকা মুনাফা পেয়েছিল। গত বছরে তা নেমে ৯৫২ কোটি টাকা হয়েছে। আর মুনাফার পরিবর্তে লোকসান করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বেসিক ব্যাংক। তবে কত লোকসান করেছে সে বিষয়ে জানা যায়নি।

রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোও ভাল মুনাফা করেছে বলে জানা গেছে। আগের বছরে জনতা ব্যাংক যেখানে ৯৭৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছিল সেখানে গেল বছরে ব্যাংকটি এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম আজাদ। অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস-উল-ইসলাম বলেন, গত বছরে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ এর মত পরিচালন মুনাফা হতে পারে। আগের বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৯৮০ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকগুলো কিছুদিন পরে তাদের বার্ষিক অনিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কাছে পেশ করবে। এরপর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য এসব তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এর আগে তা প্রকাশের ওপর এসইসির বিধিনিষেধ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বেশ কিছু ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা প্রকৃত (নীট) মুনাফা নয়। পরিচালন মুনাফা থেকে কর, প্রভিশনসহ অনেক কিছু বাদ দিয়ে প্রকৃত মুনাফা হিসাব করা হবে।

ইত্তেফাক/এসি