অর্থনীতিতে আশানুরূপ কাঠামোগত রূপান্তর সাধিত হয়নি। কৃষি খাতে একদিকে যেমন পণ্যের বৈচিত্র্য নেই, অন্যদিকে কৃষি খাতে উত্পাদনশীলতাও কমছে। তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি কমছে। অপরদিকে সেবা খাত দক্ষতার অভাবে ভুগছে। অর্থনীতির মৌলিক সমস্যার অচলায়তনিক অবস্থার পাশাপাশি বছর জুড়ে দেশের আর্থিক খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত থেকেছে। ঋণখেলাপ সংকটের কোনো আশু সম্ভাবনাও দেখা যায়নি। অপরদিকে মূলধন সংকটের ফলে বিনিয়োগে নিম্নমুখিতা লক্ষ করা গেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ব্যবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় নি, বরং ঘনীভূত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণ এর বছর শেষের মূল্যায়নে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে। এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদায়ি বছরে সামষ্টিক অর্থনীতির গুণগত পরিবর্তন ও জনগণের সেবাপ্রাপ্তির দুষ্প্রাপ্যতার সমধানে কোনো প্রণিধানযোগ্য পদক্ষেপ চোখে পড়ে নি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি স্তিমিত থেকেছে। প্রতিষ্ঠানটি তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, নানা প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের চাপে পড়ে পরিবেশ সুরক্ষার মতো জীবন-মরণ প্রসঙ্গটি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায় নি। রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হওয়ায় অর্থনীতির চলমান গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর সময়কালে ৬৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এ সময়কালে কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
গত বছর একই সময়ে কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বাস্তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা কম অর্জিত হয়েছে। সরকারকে ব্যাংক থেকে ধার করতে হচ্ছে। অপরদিকে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকঋণ পাচ্ছে না টাকার অভাবে। ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। অপরদিকে ঋণখেলাপিদের থেকে টাকা আদায়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে নি। প্রতি বছরই প্রচুর পরিমাণে টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমায় সঞ্চয়ও হ্রাস পেয়েছে। আবার বিনিয়োগও কম হচ্ছে। গতবারের মতো ২০১৯ সালেও বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি বজায় ছিল। এ বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে সার্বিক লেনদেনের ঘাটতি ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। সরকার রেমিট্যান্স বৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করছে; কিন্তু বাস্তব চিত্র তা বলে না।
চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাসে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সংখ্যা ৬ লাখ ৪ হাজার ৬০ তে হ্রাস পেয়েছে যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬২। উন্নয়ন অন্বেষণ বলছে—রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়া সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সেরকম বাড়ে নি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭ সাল থেকে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে আটকে আছে। দারিদ্র্য কমার হার কমেছে যা উচ্চ প্রবৃদ্ধির হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, পুঁজির অবাধ পাচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতার মধ্যে অসমতা হুহু করে বাড়ছে।