বলা হইয়া থাকে, জগতের কোনো আর্টই নূতন আবিষ্কৃত কিছু নহে। ইহা পূর্বের অন্য কোনো না কোনো আর্টের ট্রান্সফরমেশন মাত্র। অর্থাত্, অন্য আর্ট দ্বারা প্রভাবিত কিংবা তাহার ছায়া অবলম্বনে সৃষ্ট। ইহাকে কি চুরি বলা যাইতে পারে?
অন্যের কিছু চুরি করিয়া নূতন কিছু সৃজন করাকে বলা হয় প্লাগারিজম; কিন্তু প্রবাদে রহিয়াছে, চুরিবিদ্যা বড়ো বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা। এই বড়ো বিদ্যার নানাবিধ প্রয়োগ দেখা যায় সমাজ-সংসার-রাষ্ট্রে। প্রখ্যাত লেখক মনোজ বসুর ‘নিশিকুটুম্ব’ গ্রন্থে উঠিয়া আসিয়াছে চুরিবিদ্যার খুঁটিনাটি। ওস্তাদ চোরদের নিকট ‘চুরি’ ব্যাপারটি যে একটি ‘আর্ট’—তাহা জানা যায় এই গ্রন্থ হইতে। জগতে কত রকমের চুরি যে রহিয়াছে! ইহার মধ্যে ‘ভাবের ঘরে চুরি’র বিষয়টি ক্ষুরধার তরবারি দ্বারা কাউকে দ্বিখণ্ডিত করিবার মতো। দ্বিখণ্ডিত হইবার পর অনুধাবন করা যায়, সর্বনাশ যাহা হইবার হইয়া গিয়াছে। ভাবের ঘরে চুরির পাশাপাশি জগত্সংসারে পদে পদে চুরির সয়লাব দেখা যায়। সম্পদ চুরি, বিদ্যাচুরি, পুকুরচুরি হইতে শুরু করিয়া ভোট চুরিও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ইংরেজিতে চুরির স্বভাবকে বলা হয় ক্লেপটোম্যানিয়া; কিন্তু প্রশ্ন হইল, কেহ চুরি করিতে চাহিলেই কি অনায়াসে চুরি করা সম্ভব? তাহা হইলে নানান ধাপে কী প্রয়োজন নিরাপত্তার শক্তবলয় তৈরি করিবার? ছিটকানি কিংবা খিল যদি চোর ভাঙিয়াই ফেলে, সিঁধ কাটিবার মতো যদি ঘরের মেঝে নরম রাখিয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে চুরির ঘটনা ঘটিলে তাহার জন্য কি গৃহস্থও দায়ী নহে? ভোট চুরির কথাই ধরা যাক। বিশ্ব জুড়িয়াই নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোট চুরির অল্পবিস্তর অভিযোগ শোনা যায়। কোথাও কোথাও তাহা শোনা যায় প্রকট আকারে; কিন্তু সিস্টেম কী বলে? যে কোনো ধরনের চুরি প্রতিহত করিতে একটি মজবুত সিস্টেম গড়িয়া তোলা হইয়াছে। যদি কোনো ক্ষেত্রে চুরির ঘটনা ঘটিয়াই থাকে, তবে বড়ো করিয়া প্রশ্ন তোলা যায়—চুরি প্রতিহতের সেই সিস্টেম কেন কাজ করিল না? কেহ যদি দেখেন যে, তাহার ভোট আগেই দেওয়া হইয়া গিয়াছে, তবে তিনি তো তাহার ভোটার আইডি কার্ড লইয়া সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ করিতে পারেন এবং তাহার নিজের ভোটটি তিনি ঠিকই প্রদান করিতে পারিবেন। কেন ভোটপ্রদানে বঞ্চিত ব্যক্তিটি তাহা করেন না? অন্যদিকে, যদি আগে হইতেই ভোট কাস্টিংয়ের মতো অভিযোগ থাকে, তবে সেইখানে প্রয়োজন হাজার হাজার মানুষের। এত শত শত ব্যক্তির পরিচয় কী? একই সঙ্গে বলা যায়, যদি কোথাও এই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়, তবে অন্যপক্ষের সমর্থককুলের সম্মিলিত প্রতিরোধ কোথায় লুকাইয়া থাকে?
সুতরাং স্পষ্ট করিয়া বলা যায়, শক্ত সিস্টেম রহিয়াছে চুরি প্রতিরোধের। অতএব পরবর্তী পর্যায়ে চুরির অভিযোগ করিবার বিষয়টি দুর্বলের প্রলাপ ভিন্ন অন্য কিছু নহে। রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি’। তেমনি ভাবে, যিনি সম্পদ অর্জন করেন তাহাকে সেই সম্পদ রক্ষা করিবার শক্তিও অর্জন করিতে হয়।