কালের গর্ভে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। এর সঙ্গে বিদায় জানাতে হলো ২০১৯ সালকে। প্রত্যাশার ঘোর কেটে তারুণ্যের জয়গান গেয়ে উপস্থিত ২০২০ সালের বিজয়ী সূর্য। অতীতকে ভুলে গিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যেক রঙিন স্বপ্নে সাজাতে নব উদ্যমে বিজয়ের জয়গান গেয়ে স্বাগত জানাতে হচ্ছে ২০২০-এর রক্তিম সূর্যকে। ভালোমন্দ ,সুখ-দুঃখ, শান্তি-অশান্তি, জয়-পরাজয়, উন্নতি-অবনতি—এসব নিয়েই জীবন। এসব কিছু নিয়েই আমাদের প্রত্যাশার ঘোর কেটে তারুণ্যের জয়গান গাইতে হবে সর্বত্র। নববর্ষে করিব পণ; আমরা গাইব তারুণ্যের জয়গান।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে এরই মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাস্তবতা, দেশীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে বৈশ্বিক ঘটনাবলি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া নতুনভাবে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, এমনকি সাধারণ মানুষের পক্ষেও খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আমাদের রাষ্ট্রও আন্তর্জাতিকভাবে পালিত উত্সব, আয়োজন ইত্যাদি দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়। এটি আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য।
এ বছর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ আশা করছে দেশ অর্থনীতিতে যেভাবে টানা এগিয়ে গেছে তা অব্যাহত থাকবে, তাতে মানুষের জীবনমান বাড়বে, বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, নতুনভাবে যারা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে আসবে তারা বেকার জীবনের অভিশাপ থেকে দূরে থাকতে পারবে। বাংলাদেশের জন্য এটি সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো ধরনের ব্যর্থতার হাতছানি ঘটলে নতুন বছরে তেমন উচ্ছ্বাস থাকবে না। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিগত বছরে যেভাবে এগিয়ে ছিল তা নতুন বছরে শুধু অব্যাহত থাকা নয়, নতুনভাবে গতি লাভের সুযোগও সৃষ্টি হতে হবে। বিশেষত আমাদের ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন সমস্যা ধরে রেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো বা ধরে রাখা দুরূহ হতে পারে। সে কারণে এ বছর আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতে অতীতের দুর্বলতা, সমস্যা এবং দুর্নাম ঘুছিয়ে আনা, কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করা তথা দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের ধারাকে সংকটমুক্ত করা।
এবার আসি রাজনীতিতে! ২০২০ সালে দেশের রাজনীতি কেমন থাকবে তা নিয়ে নানা জনের নানা মত এবং প্রত্যাশা রয়েছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ সালে প্রায় তিন দশক পরে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বছরব্যাপী জন্ম নেয় তুমুল আন্দোলনের। এই আন্দোলন আর অপসংস্কৃতির রাজনীতি যে এই বছরে সমাধান হবে এমনটি নয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন এর প্রভাব পড়তে পারে ২০২০ সালেও। তবে একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান হবে এমনটি প্রত্যাশা তরুণদের।
তরুণ প্রজন্মের ধারণা দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দেশের আর্থসামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করুক। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু মিছিল, মিটিংয়ে আবদ্ধ থাকুক—তা বোধ হয় অনেকেই এখন আর সঙ্গত মনে করছে না। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে তাদের করণীয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে, তারা ক্ষমতায় গিয়ে কীভাবে সেগুলোর বাস্তবায়ন ঘটাবে তা তুলে ধরবে। একইভাবে সরকারের করণীয় কী তা তুলে ধরা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন আছে, হতাশাও আছে। এর পরিবর্তন চায় তরুণ প্রজন্ম। ২০২০ সালে সিংহভাগ পরিবর্তন দৃশ্যমান হোক—সেটি প্রত্যাশা সবার।
বিগত সালে জঙ্গিবাদকে নিয়ে বাংলাদেশ বড়ো ধরনের সমস্যা অতিক্রম করেছে। ২০২০ সালে জঙ্গিদের তত্পরতা যেন নতুন করে সংকটের সৃষ্টি না করতে পারে সেই প্রত্যাশাও করে অনেকে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জঙ্গিবাদ অন্যতম জটিল এবং বড়ো সমস্যা। বাংলাদেশের অর্জন নস্যাত্ হয়ে যেতে পারে জঙ্গিবাদের উগ্র প্রভাবের কারণে। বিশেষত আমাদের মেধাবী তরুণদের এই অন্ধ বিশ্বাসের চোরাগলি থেকে উদ্ধার করে আনতে হবে, তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে সৃজনশীল, উত্পাদনশীল কাজে—যেখানে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তারা যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারবে। নতুন বছরে আমরা যদি এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারি তাহলে বাংলাদেশ ২০২১ সালে আরো বেশি প্রত্যাশা নিয়ে পদার্পণ করতে পারবে। সর্বদা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক, মঙ্গল ও উন্নয়নের ধারায় অগ্রসর হোক—এমন প্রত্যাশা করি আমরা তরুণ প্রজন্ম।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়