সি.এম. নূরুল হক আমার সহপাঠী ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা এসএম হলে থাকতাম। একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ার পর তাকে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়। তার সঙ্গে আমার জীবনের অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি জড়িত। সে কথায় পরে আসছি।
ওর পুরো নাম চৌধুরী মোহাম্মদ নূরুল হক। তার রুমের দরজায় সংক্ষেপে সে নিজের নাম লিখেছিল সি.এম. নূরুল হক। তাই অনেকে তাকে শুধু সি.এম. বলে ডাকত। তাতে সে আপত্তি করত না। বরং খুশিই হতো। চিফ মিনিস্টারকেও সংক্ষেপে সি.এম. বলা হয়।
সি.এম. নূরুল হকের গায়ের রং কালো। দীর্ঘদেহী। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। আমাদের সাথে সে বেমানান ছিল। তবুও আমরা সবাই বন্ধু ছিলাম। আমাদের আরেক বন্ধু তালুকদার ইকবাল হোসেন তাকে হাতি বলে খেপাতে চাইত। কিন্তু সে খেপত না। একদিন বিকেলে আমরা কয়েক বন্ধু হলের লনে বসে গল্প করছিলাম। এমন সময় ইকবাল সেখানে এল। সে সি.এম.-এর উদ্দেশে বলল, হাতি কেমন আছো? সি.এম. হাসতে হাসতে বলল, আমাকে যদি বলিস হাতি, তোকে মারব এক লাথি। আমরা সবাই একসঙ্গে হেসে উঠলাম। ইকবাল রাগ করে সেখান থেকে চলে গেল। এরপর থেকে সে আর কখনো সি.এম.-কে হাতি বলত না।
সি.এম.-এর বই পড়ার অভ্যাস ছিল। ইতিহাস আর কবিতার বই বেশি পড়ত। সে কবিতা লেখার চেষ্টা করত। অনেক লিখেছেও। কিন্তু সেগুলো কবিতা হতো না। সাহিত্য সম্পর্কে তার একটা নিজস্ব মতামত ছিল। সে বলত, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ কবিতা লেখা। প্রবন্ধ, গল্প আর উপন্যাস হচ্ছে মস্তিষ্কজাত। কবিতার জন্ম হূদয়ে। কষ্ট করে আর যা-ই হোক ভালো কবিতা লেখা যায় না। কবিতা হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত। চেষ্টা করে বড় ব্যবসায়ী হওয়া যায়, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও হওয়া যায়। কবিতা লিখতে পারলেই কবি হওয়া যায় না।
এ সময় ঢাকার সিনেমা হলে ভারতীয় ছায়াছবি ‘আম্রপালি’ চলছিল। সি.এম. সতেরবার ছবিটি দেখে। সে নায়িকা আম্রপালির প্রেমে পড়ে যায়। তাকে নিয়ে সে একটি কবিতা লেখে। কবিতাটি আমাদের পড়ে শোনায়—
‘আম্রপালি, আম্রপালি
আমার বাড়ি নোয়াখালি।
আমার হলো সর্দিকাশি
তোমায় আমি ভালোবাসি।’
এ ধরনের অনেক কবিতা লিখে সে আমাদের হাসির খোরাক জোগাত। একদিন আমরা কয়েক বন্ধু রমনা পার্কে বেড়াচ্ছিলাম। আমাদের অদূরে কয়েকটি মেয়ে বসে ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে হাসাহাসি করছে। আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে ওদের হাসির কারণ জানতে চেষ্টা করছিলাম। সি.এম. বলল, কী দেখছিস? আমি বললাম, মেয়েগুলোকে দেখছি। সে মুখটাকে কৃত্রিম গম্ভীর করে বলল, দেখো বন্ধু, দেখো। কিন্তু মনে রেখো, ওদের পেটে ‘স্টুল’ আছে। ওর কথা শুনে আমরা হেসে মরি।
সি.এম. যদিও কবিতার বই বেশি পড়ত, কিন্তু তার হাতে সব সময় থাকত ড. নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস’ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। লিখেছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এটি তার প্রিয় গ্রন্থগুলোর একটি। আমি তাকে বললাম, পড়িস কবিতা, তোর হাতে ‘বাঙালীর ইতিহাস’ কেন? আমার কথা শুনে সি.এম. খুব সিরিয়াস হলো। বলল, যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, সে জাতির ভবিষ্যত্ অন্ধকার।
একদিন আমরা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সি.এম. বলল, ভাষা-সংস্কৃতির সাথে প্রত্যেক জাতির নাড়ির যোগ থাকে। একে কখনো বিচ্ছিন্ন করা যায় না। বিচ্ছিন্ন করলে দেখা দেয় সে জাতির অস্তিত্বসংকট। বাঙালি হাজার বছর না খেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু গান না গেয়ে থাকতে পারে না। প্রত্যেক জাতির একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। নিজস্ব পরিচিতি থাকে। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে সে জাতির একটি স্বাধীন ভূ-খণ্ড থাকা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে সি.এম. বন্ধু আনোয়ার হোসেন খানের একটি গল্প বলল, এক লোকের টাকা-পয়সা সবই আছে। কিন্তু তার নিজস্ব কোনো পরিচিতি নেই। একদিন সে রাস্তার ধারে কয়েকটা বিচিকলা নিয়ে বিক্রি করতে বসল। এক পথচারি তাকে বলল, তোর বিচিকলা কে কিনবে? লোকটি বলল, না কিনুক, লোকে তো আমাকে দোকানদার বলবে। মানুষের কর্মফলই তার পরিচয় বহন করে। তার একটি নিজস্ব পরিচিতি থাকতে হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত না হানলে আমাদের আত্মোপলব্ধি ঘটতে আরো সময় লাগত। ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীন জাতিসত্ত্বা বিকাশের প্রথম সংগ্রাম।
সি.এম. নূরুল হক রাজনীতিসচেতন ছিল। তখনকার সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের সভা ও মিছিলে সে যোগ দিত।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাস করার পর আমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। অনেক বছর কেউ কারো খবর রাখি না। নিজ নিজ কর্মজীবন নিয়ে সকলে ব্যস্ত। বুড়িগঙ্গার বুকে অনেক পানি গড়িয়ে যায়।
একদিন গুলিস্তান সিনেমা হলের মোড়ে হঠাত্ সি.এম.-এর সাথে আমার দেখা। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরি। জিজ্ঞেস করি, কিরে সি.এম. কেমন আছিস? সে সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়, ভালো। তুই কেমন?
আমাদের মধ্যে অনেক গল্প হয়। সি.এম.-এর চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। রুক্ষ চেহারা। চুলে পাক ধরেছে। দাঁড়ি রেখেছে। দেশের বাড়িতে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে। মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিল সে। তাদের ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে তার পক্ষে চাকুরি করা সম্ভব ছিল না। বিয়ে করেছে। দুই ছেলে, এক মেয়ে। গুলিস্তানের মোড়ে এসেছে ফুটপাত থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু পুরনো জামাকাপড় কিনতে। চতুর্থ সন্তানের জন্মের সময় স্ত্রী মারা যায়। তার দু’মাস পরে মারা যায় বাবা।
দেশে তখন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছে। ঢাকা শহর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। অনেক কথার পর সি.এম. বলল, এবার দেশ স্বাধীন হবে। বাঙালি জাতি তার নিজস্ব একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পাবে। যে জাতি তার সংকট বুঝতে পারে এবং পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে চায় তাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। এখন দরকার শুধু জাতীয় ঐক্য এবং একজনের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। শেখ মুজিব কি পারবেন?
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এক বন্ধুর কাছে শুনলাম, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সি.এম. বিশ্বস্ত কয়েকজন সাহসী ছাত্রকে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গঠন করে। যুদ্ধে তারা অনেক পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারকে হতাহত করে। একবার সে গুরুতর আহত হয়। ডান পায়ে গুলি লাগে। সুস্থ হয়ে সে আবার অপারেশন শুরু করে। এলাকায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। রূপকথার নায়কে পরিণত হয় সে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সি.এম.-এর বাড়ির অদূরে একটি সরকারি বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করে। তারা মানুষের বাড়িঘর লুটপাট করতে থাকে। নারী ধর্ষণ করে, আগুন জ্বালায়, অকারণে মানুষ হত্যা করে জনমনে ভীতির সঞ্চার করার চেষ্টা করে। সি.এম.-কে ধরার জন্য অর্থের লোভ দেখিয়ে লোক নিয়োগ করে।
মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে একদিন সি.এম. বাড়ি এসেছিল মাকে এক নজর দেখতে। রাজাকারের দল টের পেয়ে যায়। তারা ক্যাম্পে পাকিস্তানি সৈন্যদের খবর দেয়। গভীর রাতে সৈন্যরা এসে বাড়ি ঘিরে ফেলে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সি.এম. একা। বাঁচার উপায় ভাবছে। এখন প্রতিরোধ করলে তার মা ও সন্তানরা মারা পড়বে। এমন কাজ এখন করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত বাঁচার উপায় না দেখে সে আত্মসমর্পণ করে। ততক্ষণে সকাল হয়ে গেছে।
সৈন্যরা সি.এম.-কে কোমরে দড়ি বেঁধে মারতে মারতে নিয়ে যায়। স্কুলের মাঠে সে দেখতে পায়—খাকি পোশাক পরা অনেক সৈন্য। কিছু লোক উর্দু বাংলা মিশিয়ে সৈন্যদের তোয়াজ করছে। তাদের পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি, মুখে দাঁড়ি। এরা রাজাকার। এরা গ্রাম থেকে গরু, ছাগল আর মেয়েদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে আসে।
স্কুলঘরটি একটি পাকা ভবন। সি.এম.-কে একটি কক্ষে বসানো হয়। ঘরের দেয়ালে দাঁড় করানো কয়েকটি স্টেনগান এবং দুটি অর্ধনগ্ন নারীর ছবি। ডান পাশের কক্ষে লোহার খাঁচায় একটি হিংস্র বিরাট বাঘ। বাঘের সামনে ইতস্তত; ছড়ানো মানুষের হাড় এবং ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মাথা। জানালা দিয়ে সেসব দেখা যায়। ভীষণ দুর্গন্ধ ভেসে আসে। বামপাশের কক্ষে ধর্ষিতা মেয়েরা। তাদের কান্না আর চিত্কার শোনা যায়। তাদের দেখা যায় না।
সি.এম.-কে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখার পর একজন বিরাট গোঁফওয়ালা মেজর এল। সে কিছুক্ষণ সি.এম.-কে ঘুরে ঘুরে দেখে। তার হাতে একটি বেতের ছড়ি। গুরুগম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে, তোম মুক্তি হায়? সি.এম. মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। মেজর বলল, ‘জয় বাংলা’ বোলো। সি.এম. বুঝল তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলে চিত্কার করল। সঙ্গে সঙ্গে মেজর তার মুখে প্রচণ্ড এক ঘুষি মারে। সি.এম. তিন ফুট দূরে ছিটকে পড়ে। তার তিনটা দাঁত ভেঙে পড়ে। মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। মেজর চুলের মুঠি ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে উর্দুতে বলে, তোমরা বাঙালিরা বেজন্মা, বেঈমানের জাত। তোমাদের মতো বজ্জাতকে কিভাবে শায়েস্তা করতে হয় তা আমাদের ভালো জানা আছে। আমাদের উপর জেনারেল নিয়াজির হুকুম হয়েছে, বাংলাদেশের সকল নারীকে ধর্ষণ করে গর্ভবতী করতে। পাকিস্তানি সৈন্যদের ঔরসজাত অবৈধ সন্তানরা হবে খাঁটি পাকিস্তানি নাগরিক। বাঙালি জাতির চেহারা পাল্টে দেবো। এরা কখনো ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তো দূরের কথা ‘জয় বাংলা’ কথাটা মুখেও আনবে না।
সি.এম. জিভ দিয়ে তার ঠোঁটের রক্ত মোছার চেষ্টা করে। মুহূর্তের জন্য তার চোখে ভেসে ওঠে বৃদ্ধা মা ও সন্তানদের অসহায় মুখ! তারপর বলে ‘জয় বাংলা’।