বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ তখন প্রায় শেষ। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন খুঁজি আর সুবিধাজনক নিয়োগের প্রতীক্ষায় থাকি। শেষ পর্যন্ত চাকরি হয়ে গেলে নতুন পোস্টিং নিয়ে মফস্বলে যাত্রা করতেই হয়। অর্ধযুগের অধিক বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে- এসব ভেবে একটু নস্টালজিক হয়ে উঠি। কাল সত্যিই ঢাকা ছেড়ে যেতে হবে!
আনমনে হাঁটছি টিএসসি চত্বর থেকে শাহবাগের দিকে।
প্রথম ভর্তি ফরম নিয়েছিলাম এই ভবনের জনতা ব্যাংক কাউন্টার থেকে। লাইনে দাঁড়ানোর সেই স্মৃতি আমাকে এখনো বিব্রত ও লজ্জিত করে। মফস্বল থেকে এসেছি। ঊর্ধাংশ ক্ষীণ নিচে ঢোলা প্যান্ট—যা তখন প্রায় অচল। আবেদন ফরম সংগ্রহের সারিতে আগে-পিছে দণ্ডায়মান স্মার্ট পোশাক আর চাল-চলনের সেই শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজকে সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে’র আব্দুর রহমানের প্রথম বেলায় রান্না করা তরকারিপাত্রের আলুর মতো অপাংক্তেয় মনে হচ্ছিল। কোনোরকমে ফরম তুলে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সায়েন্স লাইব্রেরি ভবনে আমার ভর্তি পরীক্ষার সিট পড়েছিল। তারপর ভর্তি, ক্লাস, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আহ্! কেমন মুনি-ঋষিদের মতো মানুষেরা ছিলেন।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে ‘ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো’ মহান মানুষের ভাষ্কর্যটি পেরিয়ে বকুলতলার দিকে যাচ্ছি, হঠাত্ শুনি, ‘স্যার, স্যার, আপনি এখানে? আপনাকে অনেকক্ষণ খুঁজে ফিরছি।’ পরিচিত স্বরের আকস্মিক সম্বোধনে চমকে উঠে পেছনে তাকাই, দেখি নীলা। আচমকা নীলা’র সামনে পড়ে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। অনেকদিন তাদের খবর রাখি না, বাসা কোথায় তাও জানি না, অথচ একসময় তাদের অনেক উপহার- উপঢৌকন, কারণে-অকারণে কিংবা উপলক্ষে প্রদত্ত নানা প্রকার সম্মানী আমাকে স্বচ্ছল জীবন দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চরম দুর্দিনে তাদের কোনো খবরই রাখিনি। নিজকে ভীষণ অপরাধী মনে হলো।
নীলাদের গৃহে তখন নিয়মিত যেতাম। প্রথম প্রথম অস্বস্তি হতো, পরে স্বস্তিদায়ক শুধু নয় বরং ওই বিশেষ সময়টা কেমন আকর্ষণ করত, মনে হতো জীবনের যাবতীয় অন্যান্য সময় শুধু নীলাদের বাসার নির্দিষ্ট সময়টুকুর জন্যই অতিবাহিত হয়ে চলে। অস্বস্তির কারণ ছিল দ্বিবিধ। ক্লাস, লেকচার, লাইব্রেরি ওয়ার্ক এসবের অবসরে বাংলা একাডেমির সেমিনার, রমনার বটমূলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বেইলি রোডের নাটক পাড়া কিংবা ফাইন আর্টস-এর বকুলতলা। এসবের মধ্যে ঘোরাঘুরিতে চমত্কার আহ্লাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু হয়েছিল—বেশ লাগত, সৌভাগ্যক্রমে ২য় বত্সরে যেতে না যেতে হলে সিটও পেয়ে গেলাম। কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। এ ধরনের খানিকটা আয়েশি জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ‘শুধু পৈতৃক ভাতা’র ওপর নির্ভর করা চলে না। তাছাড়া, সহপাঠীদের অনেককেই দেখলাম কোচিং-টিউশনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বেশ দু’পয়সা রোজগার করছে- তাতেও উত্সাহিত হলাম।
নীলা পড়ত ভিকারুন্নেসায় নবম শ্রেণিতে, এক বন্ধুর সূত্রে যুক্ত হলাম তাদের বাসায়। ‘ছাত্রী’ হিসেবে যতটা মেধাবী ছিল তার চাইতে বেশি ছিল অনুসন্ধিত্সু। তার অদম্য কৌতূহল আর জিজ্ঞাসার মুখে শুরুতে কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও ক্রমশ সামলে উঠলাম এবং পরবর্তী সময়ে তা উপভোগ্য হয়ে উঠল।
তারা মা-মেয়ে আর নীলার একটি ছোট ভাই—এই নিয়ে সংসার। নীলক্ষেত থেকে সামনে এগিয়ে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের অল্প দূরেই ছিল তাদের বাসা। সুপরিসর, চমত্কার ফ্ল্যাট। নীলার বাবা বিদেশে থাকতেন এবং ভালো উপার্জন ছিল। আমাকে বেশ ভালো সম্মানী দিত। মাঝে-মধ্যে বাসার অন্য সদস্যদের জন্য নানা জিনিসপত্র পাঠানো হলে তাতে আমার জন্যও কিছু না কিছু থাকত।
দিনকাল এক প্রকার ভালোই যাচ্ছিল কিন্তু গোল বাঁধাল নিয়তি। আকস্মিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হলেন নীলার বাবা। মাস কয়েক কঠিন এ রোগের ব্যয়বহুল কিন্তু নিরাময়হীন চিকিত্সা শেষে নীলার বাবা অকালে সংসার থেকে ছুটি নিলে তাদের পরিবার যেন শাব্দিক অর্থেই অথই জলে ভাসল। তাদের বাসা বদল হলো, আকারে-আয়তনে ক্ষুদ্রতর হলো, দামি আসবাব-পত্রগুলো ক্রমশ কমতে লাগল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে নীলা’র এইচএসসি পরীক্ষা দেয়াটাও বিশেষ কষ্টকর হয়ে উঠল। নিজের কর্মচক্রে বুঁদ হয়ে পরে তাদের খবর আর বিশেষ রাখা হয়নি।
কিছুটা আত্মসংবরণ করে আস্তে আস্তে পূর্ণদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম। গড়পড়তা মানের একটি জামা ওর পরনে। পায়ে সাধারণ এক জোড়া স্যান্ডেল। একহারা গড়নের নীলা বরাবর সুন্দরীই ছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে একধরনের নিষ্প্রভ, ম্লান ছায়া যেন তার সারামুখে লেপ্টে আছে।
‘স্যার, আপনার একটু সময় হবে?’ নীলা কেমন গোধূলি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে। অপরাধবোধ, জড়তা, দ্বিধায় আমার মুখ ফোটে না, বিদ্যমান পরিস্থিতি সে বুঝতে পারে কিনা আমায় বুঝতে দেয় না। অন্তর্গত সংশয় বিদ্যমান অবস্থায় বাহ্যত যাবতীয় দ্বিধা ঝেড়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই হবে, কিন্তু তার আগে বলো, তোমরা কেমন আছ? তোমার আম্মা, মানে আন্টি ভালো আছে তো? আসলে অনেকদিন তোমাদের খবর নিই না, নিজে খুব লজ্জিত বোধ করছি, নীলা। ‘সেসব কথা থাক স্যার, আমি, মা আমরা ভালো আছি।’
আবার নীরবতা।
আমার মুখে কথা জোগায় না। আসলে নীলাদের অর্থানুকুল্যমাত্র মূল নয় বরং আমি যে একধরনের ঘোর লাগানিয়া একদা তার কৃপাপ্রার্থী ছিলাম—সে সত্য আমাদের কারো বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে বরাবরই সে ছিল শীতল আর উদাসীন, আমিই উপযাচক হয়ে তার করুণাপ্রার্থী ছিলাম। অথচ সেই আমিই পরিস্থিতির ফেরে তাকে বিস্মৃত হয়ে গেলাম। সুতরাং নীরবতা ভাঙা আমার পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে ওঠে বৈকি!
‘স্যার, জানতে চেয়েছিলাম, একটু সময় হবে কি?’
আমি আবারো সচকিত হয়ে উঠি, তাড়িয়ে ফেরে অকাট্য লজ্জা।
বিষম খাওয়ার মতো আয়াসসাধ্য কাশি কিংবা গলা খাঁকারি দিয়ে নিজকে সামলানোর চেষ্টা করি এবং বলি, ‘তোমার জন্য কী করতে পারি, নীলা?’
‘কিছুই করতে হবে না, স্যার’ নীলার নির্লিপ্ত জবাব। ‘সেই পাকুড় গাছটি নিতে এসেছি। অবশ্য, যদি থাকে বা আপনি দিতে ইচ্ছা করেন।’
পাকুড় গাছের একটি বনসাই এনেছিল নীলার বাবা দূর দেশ থেকে। নীলাদের সেই রমরমা যুগে বিশেষ কোনো কারণে অন্য অনেক মূল্যবান জিনিসের তুলনায় এই ‘বনসাই’টির প্রতি নীলার বিশেষ প্রযত্ন আমার নজর এড়ায়নি। অবস্থার বদল হলে নীলারা যখন ক্ষুদ্র বাসায় স্থানান্তরিত হয়, তখন অনেক জিনিস বিক্রি-টিক্রি করে ফেলছিল এমনকি এই বনসাইটিও বিক্রির কথা উঠেছিল। সেরকম এক বিকেল বেলা নীলা বনসাইটি আমায় গচ্ছিত রাখতে অনুরোধ করে বলেছিল, তার বাবার সর্বশেষ এবং অত্যন্ত প্রিয় স্মৃতি হিসেবে সে বামন বৃক্ষটি যতদিন সম্ভব নিজের কাছে রাখতে চায়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি রাখা বা যত্ন করার অবস্থা তাদের নেই এবং সবচেয়ে বড় কথা, উচ্চ বাজারমূল্যের কারণে তার মা’র পক্ষে যখন তখন এটি বিক্রি করে ফেলার আশঙ্কা অত্যন্ত প্রকট। তাই নীলার ইচ্ছা, ফিরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত বৃক্ষটি যেন আমার হেফাজতে রাখি।
অদ্ভুত মেয়ে নীলা!
আমার মন খারাপ হয়, আবার মৃদু আমোদও বোধ করি। মানুষের মন! কখন যে কোন বিষয়ে বা কোন ব্যক্তির বা বস্তুর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে বোঝা দুষ্কর। সানন্দে বামন বৃক্ষটি আমার হেফাজতে নিয়ে আসি। প্রথম প্রথম বেশ যত্ন-আত্তি করতাম। নীলাকে জানাতামও, কিন্তু পরে হোস্টেল ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে এ ছোট উদ্ভিদটিকে নিজের সঙ্গী করিনি। তবে, আমার স্থলাভিষিক্ত নতুন রুমমেটকে বয়স্ক বৃক্ষ শিশুটির বৃত্তান্ত জানিয়ে সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার অনুরোধ করেছিলাম। গাছটির ইতিবৃত্ত আমার কাছে এ পর্যন্তই। বহুদিন আমার এক সময়ের অশেষ প্রিয় নীলা এবং তার প্রিয় বনসাই কারো খবরই রাখিনি।
মানুষ কত স্বার্থপর হয়!
‘কী? কথা বলছেন না যে বড়।’
নীলার তাগাদায় সম্বিত্ ফিরে পাই।
হ্যাঁ, গাছটি তোমাকে ফিরিয়ে দেব, অবশ্যই দেব, চল।
এই বলে নীলাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সাবেক আবাসিক হলের দিকে যাই। মনে মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে, শুধু সময়মতো একটু একটু পানি দিলেও গাছটা অন্তত বেঁচে থাকবে। নীলাকে নিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষের সম্মুখে গিয়ে উদভ্রান্ত দৃষ্টিন্তে দেখি সামুদ্রিক শুটকি মাছের মতো, সর্বাঙ্গ শুকনো কাঠি হয়ে আছে গাছটি, ঠিক যেন নীলার বিশীর্ণ দেহ।
আমি যতক্ষণে পুনরায় মাথা তুলে নীলার দিকে তাকানোর মতো শক্তি সঞ্চয় করি—ততক্ষণে সে যেন কোথায় হারিয়ে যায়।