বাংলাদেশের অখ্যাত গোকর্ণঘাট গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিতাস নদীর পাড়ের অন্ত্যজ শ্রেণির এক অখ্যাত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে অদ্বৈত। পারিবারিক পদবীসহ পুরো নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) । তিতাসপাড়ের অদ্বৈত একটি উপন্যাস দিয়েই সাহিত্যাঙ্গনে আজ চিরঞ্জীব। তাঁর কালজয়ী সেই উপন্যাসটির নাম ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। শৈশব, কৈশোর, বয়ঃসন্ধিক্ষণ আর যৌবনের প্রারম্ভের সঙ্গের সাথী তিতাস নদী । এই তিতাস নদী ও তার পাড়ের নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু ও প্রকৃতিকে নিয়েই অদ্বৈতের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লেখা। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটির ভূমিকায় অদ্বৈত যা লিখেছেন তা থেকে এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু উঠে এসেছে অনবদ্য আঙ্গিকে। তিনি ভূমিকায় লিখছেন, ‘তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।’
অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর জন্য একনামে পরিচিত। তিতাসপাড়ের অদ্বৈতের বহুমাত্রিকতা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর আড়ালে ডাকা পড়ে আছে। অদ্বৈত মল্লববর্মণের ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক পরিচয়ের বাইরেও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর পদচারণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী এই লেখককে প্রচারের আলোয় আনার ক্ষেত্রে অন্যধারার চলচ্চিত্রকার প্রয়াত ঋত্বিক ঘটকের অবদান প্রশংসার দাবি রাখে। ঋত্বিক ঘটকই প্রথম অন্ত্যজ শ্রেণির নরনারীর জীবনসংগ্রামের কাহিনি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রে রূপদান করে অদ্বৈতের মতো লেখককে লাইম লাইটে নিয়ে আসেন।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের অকালপ্রয়াণে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা অন্তরালে থেকে গেছে। ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক ছাড়াও অদ্বৈত একজন প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অনুবাদক, কবি ও লোক-সাহিত্য গবেষক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখেছেন তা তুলে ধরার আগে তাঁর পোড় খাওয়া জীবনের কাহিনি তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ ব্রিটিশ ভারতের কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার তিতাস নদী তীরবর্তী গোকর্ণঘাট গ্রামে মালোপাড়ায় এক হতদরিদ্র পরিবারে ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম অধরচন্দ্র মল্লবর্মণ। ধীবর অর্থাত্ জেলে গোষ্ঠীর নাম মালো। পেশা মাছ ধরা মাছের কেনাবেচা। শৈশবেই বাবা-মাকে হারান তিনি। গ্রামের জেলেদের অর্থিক সাহায্যে তাঁর লেখাপড়ার খরচ চলে। ১৯৩৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের অন্নদা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে ১৯৩৪ সালে শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে।
জীবন-জীবিকার জন্য তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে মাসিক ‘ত্রিপুরা’র সাংবাদিক হিসেবে শুরু হয় কর্মজীবন। ১৯৩৬ সালে শ্রীকাইলের ক্যাপ্টেন নরেন দত্তের ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় যোগ দেন। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র। অদ্বৈত কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহকারী হিসেবে সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৯৪১ পর্যন্ত সম্পাদকরূপে দায়িত্ব পালন করেন। একটানা ৭ বছর চলার পর ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্তের মালিকানাধীন সাপ্তাহিক নবশক্তি বন্ধ হয়ে যায়।
নবশক্তি পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ’র ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় আবুল কালাম শামসুদ্দীনের মনোনয়নে তারই সহকারী হিসেবে অদ্বৈত ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় যোগদান করেন। ক্রমে ক্রমে মোহাম্মদীর সম্পাদনার ক্ষেত্রে মূল কর্তাব্যক্তিতে পরিণত হন অদ্বৈত। তিনি নামে-বেনামে মোহাম্মদীতে বেশ কিছু রচনা প্রকাশ করেন। ১৯৪৫ পর্যন্ত তিন বছর মোহাম্মদীতে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে একইসঙ্গে ‘আজাদ’ ও ‘কৃষক’ পত্রিকায় পার্ট টাইম কাজ করেন।
প্রকাশনা জগতের পুরোধা কলকাতার আনন্দবাজারগোষ্ঠী। একসময় অদ্বৈত তাদের অন্যতম সাহিত্য বিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দেশ’-এর স্বনামধন্য সম্পাদক সাগরময় ঘোষের সাহচর্যে আসেন। ১৯৪৫ সালের দিকে অদ্বৈত সাগরময় ঘোষের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’-এ ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। তার বেশকিছু কবিতা গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদ দেশ ও অন্যান্য ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া পরবর্তীসময়ে নবযুগ, কৃষক ও যুগান্তর পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বভারতীর প্রকাশনা শাখায় খণ্ডকালীন চাকরিও করেন। প্রসঙ্গত বলতে হয়, ১৯৩৯ সালে তিনি চয়নিকা পাবলিশিং হাউস গঠন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বন্ধু—কালিদাস মুখোপাধ্যায়, রাখালদাস চক্রবর্তী, সতীকুমার নাগ, সনত্কুমার নাগ প্রমুখ। ঠিকানা : ৭ নবীন কুন্ডু লেন, কলকাতা। ১৯৪০ সালে তিনি ‘দলবেঁধে’ গল্প সংকলন সম্পাদনা করেন। যৌথ সম্পাদক ছিলেন কালিদাস মুখোপাধ্যায়, রাখালদাস চক্রবর্তী, সতীকুমার নাগ। প্রকাশক ছিলেন সনত্কুমার নাগ। এরই মধ্যে তিতাসপাড়ের মত্স্যজীবী জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতকে তুলে ধরে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নামে কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেন। মর্মস্পর্শী এ উপন্যাস প্রথমে মোহাম্মদী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু কয়েকটি অধ্যায় প্রকাশের পর পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে যায়। পরে বন্ধু ও পাঠকদের অনুরোধে আবার কাহিনিটি লেখেন। মৃত্যুর আগে কাঁচড়াপাড়া যক্ষ্মা হাসপাতালে যাবার আগে পাণ্ডুলিপিটি বন্ধুদের দিয়ে যান। ১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল কলকাতায় মৃত্যুবরণ করার কয়েক বছর পর উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ মত্স্যজীবী ‘মালো’ সম্প্রদায়েরই মানুষ হয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তর্দৃষ্টির আলোকে ধীবর সমাজের নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামের সাধারণ কাহিনিকে অসাধারণ নৈপুণ্যে উপস্থাপন করেছেন, যা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে উচ্চাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছাড়াও তিনি ‘রাঙামাটি’ ও ‘শাদা হাওয়া’ নামে আরো দুটি উপন্যাস রচনা করেন। ‘শাদা হাওয়া’ রচনা শেষ করেন ১৯৪২ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ‘সোনারতরী’ পত্রিকায় ছাপা হয় ১৯৪৮ সালে বা ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে। ‘শাদা হাওয়া’ উপন্যাসে ৪ পরিচ্ছদ সন্নিবেশিত হয়েছে। পরিচ্ছদগুলো হলো : প্রথম পরিচ্ছদ : পটভূমি, দ্বিতীয় পরিচ্ছদ : সেন্টিসমইলে টমি, তৃতীয় পরিচ্ছদ :শ্রমিক নেতার স্বপ্ন, চতুর্থ পরিচ্ছদ : গুডবাই, গুডবাই, জীল!
অন্যদিকে, ‘রাঙামাটি’ উপন্যাসটি ১৯৪৩-৪৫ সময়ের লেখা। তা মাসিক ‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকায় ১৩৭১-এর বৈশাখ থেকে চৈত্র ১২ সংখ্যায় ১টি বাদ দিয়ে ১১ দফায় ছাপা হয়।
বক্ষ্যমান নিবন্ধের বিষয়ে ফিরে গিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করব প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অনুবাদক, কবি, লোকসাহিত্য বিষয়ক লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণকে উপস্থাপন করতে। পত্রিকায় চাকরির কারণে পেশাগত দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় সাহিত্য সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করার সুযোগ পান। স্বল্পকালীন জীবনে অদ্বৈত মল্লবর্মণ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। এছাড়াও তিনি বহু শিশুপাঠ্য কবিতাও রচনা করেছেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরোলেও চল্লিশের দশকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থ সিরিজ আকারে লিখে তিনি বিশেষভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রসঙ্গত বলতে হয়, অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো একজন লেখককে নিয়ে যতটা গবেষণা হওয়া উচিত ততটা এ পর্যন্ত হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে সম্প্রতি কলকাতার দে’জ পাবলিকেশান থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর অচিন্ত্য বিশ্বাসের সম্পাদনায় ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে। অচিন্ত্য বিশ্বাসের লেখা থেকে জানা যায়, তিনি রচনাসমগ্র প্রকাশের পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্যমোদীদের আমন্ত্রণে বহুবার অদ্বৈতের জন্মস্থান গোকর্ণঘাট গিয়েছিলেন। তিনি কিছু দুষ্প্রাপ্য লেখা উদ্ধার করে অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র প্রকাশ করেছেন।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রবন্ধ, অনুবাদ, গল্প, কবিতা লেখার পাশাপাশি লোকসাহিত্য সংগ্রহে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। আমরা এখানে তাঁর সৃজনকর্মের পরিচয় তুলে ধরছি—
প্রাবন্ধিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ : অদ্বৈতের লেখা প্রবন্ধগুলোর মধ্যে যেগুলোর হদিস পাওয়া যায় সেগুলো হলো : ১. ভারতের চিঠি—পার্ল বার্ককে, ২. নাটকীয় কাহিনী, ৩. নাটকের গোড়াপত্তন, ৪.পাত্রপাত্রী নির্বাচন, ৫. প্রয়োজন, ৬. প্রথমপাঠ, ৭. প্রথম মহড়া, ৮. আরো মহড়া, ৯. ফ্রেস রির্হাসেল, ১০. নাটকে নাট্যকারের স্থান, ১১. সিরাজের কাল, ১২. কাব্য সমালোচনা (একটি চিঠি), ১৩. প্রথম রজনী, ১৪. প্রথম রজনীর পর, ১৫. প্রাচীন চীনা চিত্রকলার রূপ ও রীতি, ১৬. ছোটদের ছবি আঁকা, ১৭. এদেশের ভিখারী সম্প্রদায়, ১৮.আম্রতত্ত্ব, ১৯. বর্ষার কাব্য, ২০. মৈত্রী সম্মেলন। ২১. বেগম রোকেয়া জীবনী পুস্তক সমালোচনা, ২২. টিএস এলিয়ট, ২৩. সম্পাদকীয়-স্তম্ভ * সাহিত্য ও রাজনীতি, ২৪. জিজ্ঞাসা, ২৫. লোক গণনা, ২৬ ভারতীয় সংস্কৃতি ইত্যাদি।
আমরা তাঁর এই প্রবন্ধগুলো পাঠ করে বুঝতে পারি তিনি প্রাবন্ধিক হিসেবে কতটা ঋদ্ধ ছিলেন। তাঁর প্রবন্ধের রচনাশৈলীর গুণের কারণে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো বিদগ্ধ পাঠকের দৃষ্টিলাভ করতে সক্ষম হয়। এই প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয় মোহাম্মদী ও অন্যান্য পত্রপত্রিকায়।
আমরা অদ্বৈত মল্লবর্মণের লেখা ‘সিরাজের কাল’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর রচনাশৈলীর পরিচয় আমরা পাই। তাঁর লেখা এই প্রবন্ধটি মাসিক মোহাম্মদী ১৩৪৭ সাল আষাঢ় ১৩শ’ বর্ষ, নবম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর লেখা অনেক প্রবন্ধেই কবি-সাহিত্যিকদের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর লেখা ‘সিরাজের কাল’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘শুদ্ধ সাহিত্যে যাঁহারা সিরাজের প্রতি অবিচার করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্বর্গীয় কবি নবীন সেনের উক্ত হইয়া থাকে। স্বর্গীয় অক্ষয়কুমার মৈত্রয় মহাশয় পর্যন্ত নবীন সেনকে ক্ষমা করেন নাই—পরবর্ত্তীগণকে যে ক্ষমা করিবেন না উহা বলাই বাহুল্য। নবীন সেন ঐতিহাসিক উপকরণ লইয়াছেন ইংরেজদের নিকট হইতে ধার করিয়া, আর কাব্যিক উপকরণ লইয়াছেন কিছুটা কল্পনা হইতে আর কিছুটা বিজাতীয় কবির কাব্য হইতে।’
অদ্বৈতের ‘নাটকীয় কাহিনী’, ‘নাটকের গোড়া পত্তন’, ‘পাত্রপাত্রী নির্বাচন’, ‘ফ্রেস রির্হাসেল’, ‘নাটকে নাট্যকারের স্থান’, ‘আম্রতত্ত্ব,’ ‘মৈত্রী সম্মেলন’, টিএস এলিয়ট ইত্যাদি প্রবন্ধগুলো প্রশংসার দাবি রাখে। প্রসঙ্গত বলতে হয়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘দেশ’ পত্রিকায় থাকাকালে টিএস এলিয়ট সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। সেটা ছিল ১৯৪৮ সাল। টিএস এলিয়টের ওপর প্রবন্ধ লেখার দায়িত্ব ‘দেশ’ পত্রিকা থেকে অদ্বৈতকে দেওয়া হয়েছিল।
‘ভারতের চিঠি—পার্ল বার্ককে শীর্ষক প্রবন্ধে অদ্বৈত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ের যন্ত্রণাকাতর মানুষের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তা কালের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে।
অনুবাদক অদ্বৈত মল্লবর্মণ : অদ্বৈত মল্লবর্মণ অনুবাদক হিসেবে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছেন ভিন্ন ভাষার উপন্যাস ও কবিতা অনুবাদ করে। শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যানগগের জীবন অবলম্বনে আরভিং স্টোনের লেখা ‘লাস্ট ফর লাইফ’-এর বঙ্গানুবাদ করেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘ জীবনতৃষা’ নামে। দেশ পত্রিকায় থাকাকালে দেশ পত্রিকার সাগরময় ঘোষের অনুপ্রেরণায় আরভিং স্টোনের লেখা ‘লাস্ট ফর লাইফ’ করেন বলে জানা যায়।
কবি অদ্বৈত মল্লবর্মণ : বাংলা সাহিত্যে তাঁর আরেকটি পরিচয় কবি অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তাঁর পিতা অধরচন্দ্র মল্লবর্মণের বসতভিটে ছাড়া আর কিছু ছিল না। এমনকি তাঁর মাছ ধরার জন্য নৌকা বা জাল ছিল না। অধরচন্দ্র নিরক্ষর হলেও কিন্তু গান বাঁধতে পারতেন। পিতার গান বাঁধার সূত্র ধরে পিতার মৃত্যুর আগে শৈশবকাল থেকেই অদ্বৈতের মধ্যে গান ও কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা জেগে ওঠে। অদ্বৈতের লেখা ‘তমালেরি ডালে বসি কোকিলায় কি বলে রে’ গানটি তারই দৃষ্টান্ত।
গল্পকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ : অদ্বৈত একজন সার্থক গল্পকার। তার পরিচয় আমরা পাই তাঁর লেখা ‘বন্দী বিহঙ্গ’, ‘গায়ন্তিকা’, ‘কান্না’, ‘স্পর্শদোষ’ ইত্যাদি গল্প থেকে। স্বল্প জীবনের অধিকারী অদ্বৈতের লেখা এখানে ওখানে অবশ্যই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তার প্রমাণ মেলে পশ্চিমবঙ্গের অভিজিত্ ভট্ট এবং অধ্যাপক মিলনকান্তি বিশ্বাস সম্পাদিত ‘অগ্রন্থিত অদ্বৈত মল্লবর্মণ’ গ্রন্থে ‘বিস্ময়’, ‘জাল ফেলা জাল তোলা’, ‘তমোনাশের মন’ এবং ‘আশালতার মৃত্যু’—এই চারটি গল্পের সন্ধান পেয়ে। বলাবাহুল্য অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাসের সম্পাদিত গ্রন্থে উপরে উল্লিখিত ‘স্পর্শদোষ’, ‘সন্তানিকা’, ‘কান্না’ এবং ‘বন্দী বিহঙ্গ’ এই চারটি গল্পের কথা পাঠকমাত্রই আগে থেকে জানেন। আজ পর্যন্ত পাওয়া অদ্বৈতের লেখা গল্পের সংখ্যা ৮টি
তাঁর এই গল্পগুলোর রচনাশৈলী, ভাষা অসাধারণ। দুঃখ-বেদনার অনুষঙ্গ তিনি তুলে ধরেছেন বিশেষ আঙ্গিকে।
লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক ও গবেষক অদ্বৈত মল্লবর্মণ : লোকসাহিত্যের ওপর লেখাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে বুঝতে পারা যায় তিনি লোকজ সাহিত্যকে অনুসন্ধানী দৃষ্টির আলোকে উপস্থাপন তাঁর গবেষণার ফসল। তিনি লোকজ সাহিত্যকে সাহিত্যের ভাণ্ডারে সন্নিবেশিত করেছেন। লোকজ সাহিত্যের ওপর অদ্বৈত লেখাগুলো হচ্ছে : ১. অপ্রকাশিত পল্লীগীতি, ২. ত্রিপুরার বারমাসী গান, ৩. তিনটি বারমাসী গান, ৪. সীতার বারমাসী, ৫. পল্লী সঙ্গীতে পালা গান, ৬. বিনোদের পালা, ৭. কটু মিঞার পালা, ৮. শেওলার পালা, ৯. বরজের গান, ১০. জলসওয়া গীত, ১১. নাইওরের গান, ১৩. পাখির গান, ১৪. ভ্যমর দূত, ১৫. মেওয়া মিছরির গান, ১৬. উপাখ্যানমূলক সঙ্গীত, ১৭. বানিয়ার গান, ১৮. ভাই ফোঁটার গান, ১৯. মাতৃস্নেহসূচক কয়েকটি অপ্রকাশিত প্রাচীন গান, ২০. পরিহাস সঙ্গীত, ২১. মাঘ মন্ডল, ২২.অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া, ২৩. অপ্রকাশিত বাউল সঙ্গীত ইত্যাদি। এই সমস্ত লোকসাহিত্য কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে যেতে বসেছিল। অদ্বৈত মল্লবর্মণ এইগুলোকে সংগ্রহ করে লোকচক্ষুর অন্তরাল থেকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন, যা তাঁর একটি অসাধারণ কাজ নিঃসন্দেহে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রথম প্রকাশিত পুস্তক ভারতের চিঠি পার্ল বার্ককে কেবল তাঁর জীবত্কালে প্রকাশিত হয়েছিল। মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৯৫৬ সালে কলকাতার পুঁথিঘর প্রাইভেট লিঃ থেকে প্রকাশিত হয় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। ১৯৯০ সালে দেবীপ্রসাদ ঘোষ সাপ্তাহিক নবশক্তি থেকে ১৮টি এবং দেশ ও আনন্দবাজার থেকে ৪টি মোট ২২টি নাতিদীর্ঘ রচনা সংগ্রহ করে বারমাসী গান ও অন্যান্য নামে প্রকাশ করেন। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে যথাক্রমে প্রকাশিত হয় শাদা হাওয়া ও রাঙামাটি।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ছিলেন। তার প্রমাণ মেলে তাঁরই লেখা একটি চিঠিতে। কাঁচরাপাড়া টিবি হাসপাতালের বি-৩ ওয়ার্ডে থাকাকালে অদ্বৈত ১৩৫৭ সালের ২৮ বৈশাখ চন্দ্রকিশোর মল্লবর্মণ নামে তাঁর এক স্নেহভাজনকে পোস্টকার্ডে লিখেছিলেন, ‘আমি এখনো হাসপাতালেই আছি। আর কতদিন থাকতে হইবে তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই। যতদূর মনে হয় আমি আরও এক বত্সর এই হাসপাতালেই থাকিতে পারিব। আমার জন্য কোন চিন্তা করিও না। আমার যতদিন ভোগ কপালে লেখা আছে ততদিন অবশ্যই ভুগিতে হইবে।’
অদ্বৈতর জীবনকাল ছিল মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের। অপরপক্ষে তারাশঙ্কর বেঁচেছিলেন ৭৩ বছর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ৪৮ বছর, সমরেশ বসু ৬৪ বছর আর বিভূতিভূষণ বেঁচেছিলেন ৫৬ বছর। অদ্বৈত ১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল কলকাতার নারকেলডাঙ্গার ষষ্ঠীতলায় তখনকার দুরারোগ্য টিবি রোগে মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে ধুঁকে ধুঁকে মুত্যুবরণ করলেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হওয়া সত্ত্বেও জীবদ্দশায় তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে অকালে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন—এটা বড় দুঃখের ও বেদনার। অন্ত্যজ শ্রেণী থেকে উঠে আসা মানুষটি তাঁর বিপন্ন জীবন থেকেই জ্ঞানের দীপ্তি ছড়িয়ে ছিলেন তাঁর অসাধারণ সব লেখায়। নিম্নবর্ণের এই মানুষটি তাঁর জীবত্কালে অন্য পাঁচজন লেখকের মতো পাদপ্রদীপের আলোয় না এলেও চিরায়ত বাংলা সাহিত্যে এখন তিনি একজন অত্যুজ্জ্বল ধ্রুবতারা।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর জন্য একনামে পরিচিত। তিতাসপাড়ের অদ্বৈতের বহুমাত্রিকতা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর আড়ালে ডাকা পড়ে আছে। অদ্বৈত মল্লববর্মণের ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক পরিচয়ের বাইরেও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর পদচারণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য