বনমোরগ

মোরগটি হাত ফসকে দেয়ালের ওপর দিয়ে পির পাগলার বাড়ির বাগানের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের গোলাগুলির শব্দে মোরগটি খোঁয়াড়ের ভেতর খুব দাপাদাপি করেছে। মন্টুর আব্বা গণ্ডগোলের আভাস আগেই টের পেয়েছিলেন। তিনি কিছু মুরগি আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলেন। শুধু একটি সাদা বড়ো মোরগ বাকি ছিল। মোরগটি ছিল মন্টুর খুব প্রিয়। সেদিন রাতের ঠাঠা গুলির শব্দে মোরগটি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। মোরগটি এখন আর রাতে খোঁয়াড়ে থাকতে চায় না। দিনভর উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ির কার্নিশে ঘোরাঘুরি করে। সন্ধ্যা হলে মোরগটিকে ধরে খোঁয়াড়ের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হয়। ২৮ মার্চ সকালে রেডিওর ঘোষণা থেকে জানা গেল আটটা-বারোটা কারফিউ থাকবে না। মন্টুর আব্বা স্ত্রী আর তার নয় বছরের ছেলেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি মনোহরদীর নিজ গ্রামে যাবার উদ্যোগ নিলেন। সকালে মন্টু গিয়েছিল মুরগির খোঁয়াড় থেকে মোরগটিকে আনতে। কিন্তু হঠাত্ তার হাত ফসকে মোরগটি চলে গেল পির সাহেবের বাড়ির পেছনের দিঘল গাছপালার ভেতর। মোরগটিকে এখন আর তারা গ্রামে নিয়ে যেতে পারবে না ভেবে তার মন খারাপ হলো।

রিকশাতে একটি সুটকেস ও একটি বেতের ঝুড়িতে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ওরা গ্রামের পথে রওয়ানা হলো।

স্টেডিয়াম এলাকায় মিলিটারি মেশিনগান ফিট করা ট্রাক দিয়ে টহল দিচ্ছে। গুলিস্তান বাস ডিপোতে এসে কোনো বাস পাওয়া গেল না। একটি কুলির মাথায় সুটকেস চাপিয়ে ওরা বাসাবো-গোড়ানের ধানখেতের আলপথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাত্রাবাড়ির কাছে এসে একটি ছোট ট্রাকের দেখা পেল। একটি হিন্দু পরিবারের সঙ্গে গাদাগাদি হয়ে ওরা চলল ডেমরা ফেরিঘাটের দিকে। একজন বলেছে, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে শিবপুরের বাস পাওয়া যাবে। নদীর ওপারের সড়কে এসে দাঁড়ায় ঢাকা শহরের তিন যাত্রী। মন্টু বস্ফািরিত নেত্রে নদী দেখে। মন্টুর প্রথম নদী দেখা। দূরে একটি স্থির নৌকার গলুইয়ের ওপর বসে থাকা একটি সাদা বককে তার ফেলে আসা সাদা মোরগটির মতো মনে হয়। হিন্দু পরিবারটি নারায়ণগঞ্জের দিকে চলে গেল। রাস্তায় কোনো বাসের দেখা নেই। দুইবার রিকশা বদল করে ওরা বাবুরহাটে এসে একটি পুরনো জিপ গাড়ির দেখা পেল। এই জিপ সার্ভিসে ওরা রায়পুরা পেরিয়ে শিবপুর সিএনবি রোডে এসে নামল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ওরা যাবে মনোহরদীর দিকে। ডানদিকে মনোহরদী যাবার কাঁচা সড়ক। সড়কটি হাতিরদিয়া হয়ে চলে গেছে পোড়াদিয়ার দিকে। মন্টুর আব্বা অনেক খুঁজে হাতিরদিয়া পর্যন্ত যাবার একটি রিকশা ঠিক করলেন। ইতিমধ্যে পথের পাশে একটি টিউবওয়েলের দেখা পেয়ে ওরা ওখানে বসে শান্তিনগরের জল খাবারের মিষ্টি দিয়ে একটি পাউরুটি ভাগ করে খেল।

সন্ধ্যার আঁধারে রিকশা চলল হাতিরদিয়া অভিমুখে। হঠাত্ একটি বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে এসে তাদের রিকাশাটি কাত হয়ে যায়। টর্চ হাতে দ্রুত এগিয়ে এল এক যুবক। যুবকটিকে দেখে মন্টুর আব্বা চিনলেন। এলাকার নামকরা ডাক্তার জনাব হাবিবুর রহমানের ছোট ভাই। নাম হীরা। হীরা টর্চের আলো ফেলে দেখল, রিকশার পেছনের একটি চাকা ভেঙে গেছে। ইদানীং গরুর গাড়ির চলাচলের কারণে রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। হীরা ওদের আজ রাতে তাদের বাড়িতে থেকে যাবার অনুরোধ করল। অদূরেই হীরাদের সৈয়দপুর গ্রাম।

ভোরবেলা সবাই ঘুম থেকে উঠে গেছে। নতুন চালের জাউয়ের গন্ধে বাড়ি ভরে আছে। গভীর রাতে ঢাকা থেকে কারা যেন এসেছেন। সকালে মন্টুরা আবার রওয়ানা হলো। মুরগির ঝোল দিয়ে গরম জাউয়ের আপ্যায়ন তারা ভুলবে না কোনোদিন।

ঘণ্টাখানেক পর রিকশা পোড়াদিয়া বাজারের লালমাটিতে এসে থামল। নদীর পাড়ে বাজার। মন্টুর আবার নদী দেখা। নদীর নাম আড়িয়াল খাঁ। সাঁকো পার হয়ে ওরা নদীর চর পেরিয়ে চলল পূর্বদিকে। এসময় একঝাঁক বক উড়ে গেল পূর্বদিকের আকাশে। সাদা বকগুলোকে দেখে মন্টুর ফেলে আসা তার সাদা মোরগটির কথা মনে পড়ল। মন্টু তার আব্বাকে প্রশ্ন করল, তার মোরগটি কি এখন খোঁয়াড়ে ফিরে এসেছে? ছেলের প্রশ্নের উত্তরে তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারা তিনজন অজানা কৃষকের মিষ্টি আলুর খেত মাড়িয়ে চলল। মন্টুর আব্বা এসময় ছেলের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, মোরগটি পির সাহেবের বাগানের গাছে নিরাপদেই থাকবে। বনের ভেতর যেভাবে বনমোরগ থাকে। মন্টু পাঠ্যবইয়ে বনমোরগের কথা পড়েছে। সে তার আব্বাকে আবার প্রশ্ন করল, তার মোরগটি কি বনমোরগ হয়ে যাবে? মন্টুর আব্বা হুঁ বলে ছেলেকে শান্ত করলেন।

সারাদেশ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। সবার স্কুল বন্ধ। ছেলেরা নদীতে নৌকা বায়। সাঁতার কাটে। মন্টুদের গ্রামের পেছনে আরেকটি ছোট নদী। সেটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা। সেই নদের বালুচর রোদে চিকচিক করে। একদিন দুপুরে মন্টু সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাত্ শোঁ শব্দে পূর্ব দিগন্তের দিকে দুটি বড়ো সারস উড়ে গেল। ধবধবে সাদা সারস দুটিকে দেখে তার স্মৃতিতে ভেসে এল রাজধানীর ছায়াবীথিতে ফেলে আসা সেই সাদা মোরগটির ছবি। তার মোরগটি হয়তো এখন বনমোরগ হয়ে গেছে।