আমার ভাস্কর্য

আমার জীবনের প্রথম ভাস্কর্য করলাম একটা স্পেস ইন্টারেস্টিং করার জন্য। বঙ্গভবনের ভেতরে ভবনের সামনে একটি ফোয়ারার মাঝে একটি ভাস্কর্য করতে হবে। সেখানে তৈরি করলাম পাখি পরিবার। আশির দশকে করা এই কাজটি একটি ইউনিক কাজ। তখন কিন্তু এদেশে ভাস্কর্যের তেমন কোনো জায়গা তৈরি হয়নি। সেসময়ের মন্ত্রীরাও এটা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এটাকে তুলে ফেলার চিন্তা করেছিলেন। উদ্বোধনের দিন অনেক বিদেশি কূটনীতিক এলেন। অনেক শিল্পরসিক ও কূটনীতিকরা এটার প্রশংসা করলেন। আমার কাজটা টিকে গেল। পরে বঙ্গভবন কর্তৃপক্ষ আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম ভাস্কর্য করলাম বর্ধমান হাউজ সংস্কারের সময়। এটা এখন বাংলা একাডেমি। ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটির প্রধান ফটকের ডান পাশে একটি মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব। এটা আমার প্রথম দিককার কাজ। রিয়্যাল ফিগারের এক মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হাতে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চারপাশে ফ্রেমে কিছু মুখ। এরপর খোলা স্পেসকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য অনেক কাজ করেছি। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে অনেকগুলো কাজ করেছি। 

প্রকৌশলী রফিক আজমের করা কয়েকটা বাড়িতে আমি প্রথম ভাস্কর্য করেছি। রফিক আজম, পলাশ এদের একটা দল আছে। এরা সবাই ভালো কাজ করে। রফিক আজম আমাকে পুরো বাড়িই দিয়েছিল। বলেছে, আপনার যেখানে খুশি সেখানে ভাস্কর্য বসান। আমি খালি স্পেসগুলো পূরণ করার জন্য নানান জায়গায় ভাস্কর্য বসিয়েছি। কোথাও বারান্দার ওপরে খালি একটা জায়গায় একটি ছোট্ট ভাস্কর্য বসিয়ে দিয়েছি। একটা খালি দেয়ালের ওপর একটা বসিয়েছি। সিটিংয়ে একটা ভাস্কর্য দিয়েছি। দুইটি বাড়িতে আমি এমন করেছি। ধরা যাক একটা খালি জায়গা বা দেয়াল। একেবারে খা খা করে। ভাস্কর্য দিয়ে স্পেসটাকে ইন্টারেস্টিং করা যায়। ঘরের ভেতরের দেয়ালে ছবি টানানো যায়। বাইরের স্পেসে ভাস্কর্যই আদর্শ। আবার অনেক বাড়িতে লম্বা লম্বা পাইপ বা অন্য কিছু দৃষ্টিকটু দেখায়। সেসব ঢেকে দিয়ে ভাস্কর্য বসিয়ে দিলে ভিন্ন একটা রূপ লাভ করে। আমি অনেক বাড়িতে ছোট-বড়ো অনেকগুলো ভাস্কর্য করেছি। সেসব ভাস্কর্য মেটাল এবং পাথর দিয়ে গড়া। বিশ্বব্যাংকের অফিসে পাঁচটা বড়ো বড়ো কাজ আছে আমার। আমেরিকায় বিশ্বব্যাংক অফিসে আমার কাজ আছে। তাই ওরা সরাসরি এখানেও কাজগুলো আমাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। না হলে এ কাজ আমার পাওয়ার কথা না। বিশ্বব্যাংক ভবনের ভেতর ৬৫ মিটার লম্বা একটি ভাস্কর্য ওপরের ভিম থেকে নিচে ঝুলিয়ে দিয়েছি। তাও নিচে থেকে ১২/১৩ ফিট ওপরে। ভাস্কর্যটা ঝুলে আছে। এটা ব্রোঞ্জ, কপার ও  স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে গড়া। সামিট গ্রুপের অফিসেও একটা কাজ আছে। এই কাজটা করেছি কয়েক বছর আগে। মেটালে করা বড়ো একটি কাজ। আর্কিটেক্ট একটা স্পেস রেখে বলেছে—হামিদুজ্জামানকে দিয়ে কাজ করান। আর কাজটা করার সময় ইন্টারফেয়ার করবেন না। তিনি যা করতে চান করতে দেবেন। সেই আর্কিটেক্টের নামটা ভুলে গেছি। তিনি বেঁচে নেই। গ্রামীণ সেন্টারেও বড়ো একটা কাজ আছে। পান্থপথে ইউটিসি ভবনের সামনে বড়ো একটি মুক্তিযোদ্ধার ফিগার আছে। এদেশে কিন্তু অনেক ভালো ভালো ভাস্কর্য হয়েছে। অপরাজেয় বাংলা, জাগ্রত চৌরঙ্গী, সাবাস বাংলাদেশ, আমার সংশপ্তক বা পাখি পরিবার পরিকল্পিতভাবেই করা। আমার মনে হয় যারা কাজ করে তাদের কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। ভাস্কর্য ভিজ্যুয়াল আর্টওয়ার্ক। এটির একটি স্থায়ী রূপ আছে। এটা থাকে দীর্ঘদিন। ভাস্করদের উচিত ভাস্কর্যের বেলায় আরো চিন্তাভাবনা করে কাজ করা। যেহেতু এটা দীর্ঘদিন থাকবে। হাজারো লোকের চোখে পড়বে। আমি যখন কাজ বসাব তখন কারো মুখ ধরে রাখতে পারব না। এটা তখন সাধারণের হয়ে যায়। তখন সাধারণ যা কিছু বলবে এখানে কিছু করার নেই। আবার যারা কাজটা করাচ্ছেন, তাদের একটা লেভেল চিন্তা করা উচিত। একটা নিয়ম, বিজ্ঞজনদের একটা কমিটির মাধ্যমে কাজটা করানো উচিত। শিল্পীরও উচিত হবে কাজটা মানসম্মতভাবে করা। শিল্পী তো আর কুমার নয়। কুমার মূর্তি গড়ে একটা থিম মাথায় নিয়ে। মূর্তি হলো একটা ধর্মের জন্য। ধর্মের বিষয়টা ভিজ্যুয়ালে আনার জন্য একটা অবয়ব তৈরি করে। ভাস্কর্য হচ্ছে ভেতর থেকে যেটা আসবে। এখানে আমি আমার মতো করে ফিগারকে যেকোনো দিকে নিয়ে যেতে পারছি। এখানে কিন্তু শিল্পীর অসীম ক্ষমতা। আর আধুনিকতা যুগের দাবি। শিল্পীকে এই শক্তিটাই ব্যবহার করতে হয় শিল্পকর্মে। যে পারে তার কাজ আলাদা করে চেনা যায়। ফিগারেটিভ ভাস্কর্যের বড়ো একটি সমস্যা—সামনে না গেলে কিছু বোঝা যায় না। পেছন থেকে কিছুই দেখা যায় না। ভাস্কর্য আমরা আট দিক থেকে দেখতে পারি।  ভাস্কর্যকে সব দিক দিয়েই ইস্টারেস্টিং করে গড়তে হবে। ভাস্কর্য একেবারে ফ্রি ফর্ম হতে হবে। যেকোনো দিক থেকে দেখে ভালো লাগতে হবে। সারা পৃথিবীতে এখন ফর্ম নিয়ে কাজ হচ্ছে। 

বাংলা একাডেমিতে আমার একটা ভাস্কর্য আছে। অস্ত্র হাতে এক মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পরপর বর্ধমান হাউজ সংস্কার হচ্ছিল। তখন আমাকে বলা হলো একটা ভাস্কর্য করার জন্য। তখন আমার এত ধারণা ছিল না। মুনতাসীর মামুন আমাকে কাজটা দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। তখন আমি ফিগারেটিভ কাজ করি। আরেকটা বড়ো কাজ আছে আশুগঞ্জ সার কারখানায়। এটা ৮৮ সালে করা। ৫০ ফুট উঁচু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশপ্তক করেছি ১৯৮৯ সালে। সংশপ্তকের আধুনিক ফর্ম হচ্ছে ইউটিসি ভবনের সামনের ভাস্কর্যটি। একই রকম আরেকটি কাজ করেছি মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে। একটু অন্য মেটেরিয়াল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ফর্ম এনেছি। আলী যাকের এই কাজটা করিয়েছিলেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরেকটি কাজ করেছি পটুয়াখালিতে। জয়বাংলা নামের ভালো একটি ভাস্কর্য।

৩৫টার মতো একক করেছি। এর মধ্যে ভাস্কর্য, পেইন্টিং মিলিয়ে। দলীয় প্রদর্শনীতে আছি নিয়মিত। পেইন্টিংয়ের জন্য যেমন ড্রয়িং করি, ভাস্কর্য করার আগে অজস্র ছোট ছোট মডেল করা হয়। এগুলোকে বলা হয় মাকেট। কাঠের, মেটাল এবং মাটির অনেক মাকেট থাকে। অনেকে মনে করেন মোড়ান দিলেই ভাস্কর্য হয়ে যায়। আমি কোথা থেকে এসেছি সেটা কেউ বোঝেই না। সবাই ভাবে হামিদুজ্জামান মেটাল বাঁকিয়ে দেয় আর ভাস্কর্য হয়ে যায়। আমি অনেক রাস্তা পার হয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। আমি এখনো নিয়মিত কাজ করি। আমার বয়স ৭২ পার হয়ে গেল। আমি অর্ধশত বছর কাজ করেছি। এই পঞ্চাশ বছর আমি কীভাবে বেড়ে উঠলাম তার একটা ধারাবাহিক চিত্র রয়েছে আমার কাজগুলোতে।