আহীর আলমের বাম পা

অটো থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়ন রফিক ছুটে আসে, কেমন আছেন স্যার?

ভালো। তোমার খবর কী?

আছি স্যার। আপনার পায়ের অবস্থা কী স্যার?

মুহূর্ত মাত্র, মেজাজ তিরিক্ষি আহীর আলমের। দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে মনে মনে বললেন, আমাকে জিজ্ঞেস করার আর কিছু নেই, বাম পা ছাড়া?  শালার মাকুন্দা। ইচ্ছে করছে গালের উপর চটকানা লাগাই...। নিজেকে সামলে  সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন আহীর আলম। হাঁটছেন বাম পায়ে একটু খুঁড়িয়ে। আহীর আলমকে দেখে এগিয়ে আসে গেটের দারোয়ান রহিম, গোপাল দাশ আর ঝাড়ুদার কান্তা। প্রায় ঘিরে দাঁড়ায় ওরা।

স্যার অনেক দিন পরে আইলেন। বলে রহিম, আপনে তো হাঁটতে পারছেন ভালোই। কার কাছে জানি হুনলাম আপনে হাঁটতে পারেন না।

মাথা নাড়ান আহীর আলম, হ্যাঁ, সাড়ে চার মাস পরে এলাম। তোমরা ভালো তো? আহীর আলম কথা বলছেন আর হাঁটছেন। সঙ্গে ওরাও। ধীরে ধীরে হেঁটে লিফটের সামনে আসেন তিনি। লিফট ছয় তলায়। বোঝা যাচ্ছে, লিফট মহাপরিচালকের দরবারে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো তিনি নামবেন। মোসাহেবরা লিফট আটকে রেখেছে। প্রায় পাঁচ মিনিট অপেক্ষার পর লিফট নিচের দিকে নামতে শুরু করে। আরো কয়েকটা তলা থেমে লিফট যখন নিচে নামে, বের হলেন মহাপরিচালক।

আহীর আলমকে দেখেই থমকে দাঁড়ান, কী অবস্থা আপনার?

আছি আর কি স্যার...!

এখন থেকে অফিস করতে পারবেন তো?

না পারলেও পারতে হবে। ছুটি তো নেই স্যার।

ছুটি কোনো ব্যাপার না। লাগলে আরো নেবেন। কিন্তু আপনার মতো অভিজ্ঞজনের বড়ো অভাব অফিসে। পায়ের অবস্থা কী? মহাপরিচালক মুখ থেকে দৃষ্টি পায়ের দিকে নামিয়ে আনলেন। সঙ্গে দাঁড়ানো পারিষদবর্গেরাও দৃষ্টি নামিয়ে আনে আহীর আলমের বাম পায়ের ওপর। প্যান্টের ভেতরে রাখা পা দেখতে পায় না কেউ। কিন্তু সবাই তাকায়, ভাবখানা এরকম, প্যান্টের মোটা কাপড় ভেদ করে পা দেখতে পাচ্ছে। বাম পায়ের ওপর ওদের দৃষ্টি পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করোটির সকল গ্রন্থিতে আগুনের বাড়ি লাগে, ইচ্ছে করে... নিজেকে সামলে নেন আহীর আলম।

আগের চেয়ে একটু ভালো স্যার।

গুড। মিনিস্ট্রিতে একটা জরুরি মিটিং আছে। বিকেলে দেখা করবেন আমার সঙ্গে...। জরুরি কাজ আছে আপনার সঙ্গে।

ঠিক আছে স্যার।

দ্রুতপায়ে চলে গেলেন মহাপরিচালক। আহীর আলম একরাশ বিরক্তি নিয়ে লিফটে উঠলেন। সঙ্গে প্রশাসনের আমীর হোসেন আর ডেসপাসের মমিন পাটোয়ারী।

সবারই একটাই লক্ষ, আমার বাম পা! আমার চেয়ে আমার বাম পা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল সব শালাদের কাছে! হ্যাঁ আমার বাম পায়ে সমস্যা হয়েছে। বাম পা দিয়ে সুষ্ঠুভাবে হাঁটতে পারি না। হাঁটলেই বাম পায়ের মাংসপেশির মধ্যে আগুনের কুণ্ডলী পাকিয়ে যন্ত্রণা তৈরি হয়। কিন্তু আমি কেয়ার করি না। আমি বাম পা-কে বাধ্য করব আমার সঙ্গে আসতে। শালার বাম পা কী মনে করেছে? যন্ত্রণায় কঁকিয়ে  উঠলে আমি ওকে রেহাই দেব? বিশ্রাম দেব? হাঁটব না? অসম্ভব...

স্যার, আপনার বাম পায়ের অবস্থা কী?

আহীর আলমের ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল। ইচ্ছে হচ্ছিল আমীর হোসেনের গালে...। আবার সামলে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমার বাম পায়ে সমস্যা ছিল, আছে। এখন একটু একটু হাঁটতে পারি, কিন্তু ব্যথা লাগে খুব।

ডাক্তার দেখাচ্ছেন না? প্রশ্ন করে  মমিন পাটোয়ারী।

এই ভোদাই চন্দনদের নিয়ে কোথায় যাওয়া যায়? এদের বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত জলে চুবিয়ে মারা উচিত। আরে বাবা, পায়ে ব্যথা হলে, হাঁটতে না পারলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে কি তোর খালুর কাছে যাব? মনে মনে বললেও নিজেকে সামলে নিয়ে আহীর আলম বললেন, হ্যাঁ ডাক্তার তো দেখাচ্ছি।

কোন ডাক্তার দেখাচ্ছেন?

বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক...

এই দেশের ডাক্তার দেখাইয়া কোনো লাভ নাই। স্যার, আপনি ইন্ডিয়া চলে যান। চেন্নাইতে অর্থোপেডিক্সের ভালো ডাক্তার আছে। আমার বড়ো মামা... লিফটের দরজা খুলে যায় আট তলায়। ঝট করে নামেন আহীর আলম। ওরা লিফটের ভেতরেই থেকে যায়। যাবে এগারো তালায়। লিফট থেকে নেমেই আহীর বুঝতে পারেন, এখন একটা চেয়ারে বসা দরকার। ব্যথায়  টনটন করছে বাম পা’টা, যেন ক্ষুধার্ত বাঘ থাবা বসিয়েছে মাংসপেশিতে। পিয়ন জামান মিয়া দেখে দৌড়ে কাছে আসে, স্যার?

একটা চেয়ার দাও।

পাশের রুম থেকে একটা চেয়ার এনে দিলে আহীর বসেন চেয়ারে। সঙ্গে সঙ্গে বাম পায়ের ভেতরের যন্ত্রণাটা কমে আসতে শুরু করে। গত কয়েকদিন থেকে এই ঘটনা ঘটছে, হাঁটতে শুরু করলেই বাম পায়ের মাংসপিণ্ডগুলো প্রবল বিদ্রোহ করে। বসে বা শুয়ে থাকলে বাম পায়ের কোনো বিকার নেই। কেমন যন্ত্রণার গহিন ট্যানেলে ঢুকে যাচ্ছেন আহীর আলম। কিন্তু আহীর আলম বাম পায়ের এই ত্যাঁদোড় যন্ত্রণার কথা ডাক্তারকে জানালে ডাক্তার বলেছে, আপনার কোমরের অপারেশনের সময় কোনো না কোনোভাবে বাম পায়ের দিকের কোনো ভাইটাল রগের ওপর আঘাত লেগেছে। হাঁটতে শুরু করলে সেই রগের সঙ্গে থাকা মাংসপেশি গুটিয়ে আসতে থাকে, ফলে আপনি ব্যথায় ভোগেন।

এই ভোগা কতদিন চলবে?

বলা মুশকিল। আপনি হাঁটাচলা কমিয়ে দিন...। শুয়ে বা বসে থাকুন মাসখানেক। ধারণা করি, রগ ঠিক হয়ে যাবে।

ডাক্তারের কথায় আহীর আলম দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, ডাক্তার আমার তো জমিদারি নাই। বসে বসে কয়েক মাস খেয়েছি। এখন আর সম্ভব নয়। অফিস করতে হবে। মনে মনে বললেও ডাক্তারকে কিছু বলেন না। জানেন কোনো লাভ নেই। ডাক্তার বলবে চিকিত্সা করাও। শুয়ে থাকো। আমার তো সংসারও চালাতে হবে। শুয়ে বসে থাকা চলবে না। সাড়ে চার মাস পরে অফিসে ঢোকেন আহীর আলম।

স্যার! আবার মমিন পাটোয়ারী সামনে, আপনার ভালোর জন্যই বলছি। ইন্ডিয়ায় চলে যান। ওখানকার ডাক্তারেরা অনেক ভালো।

মমিন, তোমরা দেশটাকে আর কত অপমান করবা? আহীর আলমের চোয়াল শক্ত, কথা বলছেন ধীরে ধীরে কিন্তু জোরালো কণ্ঠে, আশপাশে দাঁড়ানো সবাই শুনতে পাচ্ছে। আর কত ন্যাংটা হবে? এখন ক্ষান্ত হও...।

হতভম্ব মোমিন পাটোয়ারী বলে, স্যার এইভাবে তো চিন্তা করি নাই।

এখন করো। না করলে আম ও ছালা সব হারাইবা। আহীর উঠে রুমের দিকে চলে যান। অনেকদিন পরে রুমে ঢুকলেন। পিয়ন জামান মিয়া সুন্দর সাজিয়ে রেখেছে রুমটা। চেয়ারে বসলেন। পানি খেলেন এক গ্লাস। এক কাপ আদা মিশ্রিত লিকার চা এনে সামনে রাখে জামান মিয়া। চায়ে চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল বাজে। চোখ রেখে দেখেলেন স্ত্রী সিলভিয়া আখতারের ফোন।

হ্যালো?

অফিসে পৌঁছেছো? সিলভিয়া আখতারের রুটিনমাফিক নীরস কণ্ঠ।

হ্যাঁ।

কোনো সমস্যা?

সমস্যা তো একটাই। হাঁটতে গেলে বাম পায়ের হাঁটুর মাংসপেশির মধ্যে আগুন জ্বলে। এখন রুমে বসে আছি। ব্যথাটা কম।

ও ঠিক হয়ে যাবে, ফোন কেটে দেয় সিলভিয়া আখতার। কয়েক মাস ধরে একজন অসুস্থ মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে ক্লান্ত। মেনে নেন আহীর। জীবনের বিন্দুতে বিন্দুতে অভিজ্ঞতার করাত সাপলুডু খেলে। বাসা থেকে বের হয়ে আসায় স্ত্রী সিলভিয়া ্আখতার, পুত্র চয়ন, মেয়ে রাখী ভীষণ খুশি। বাসাটা রোগীমুক্ত। হোক না পিতা, স্বামী একজন রোগীকে অনেকদিন সহ্য করা কঠিন। অসুখ হলেই মানুষ রোগী, মরে গেলে মানুষ লাশ, নির্দিষ্ট পোশাক পরলে পুলিশ... বিয়ের পোশাক পরলে কনে অথবা বর... বাবা মরলে এতিম...স্বামী মরলে বউ বিধবা... অবস্থান ভেদে মানুষের রূপান্তরে মুগ্ধ আহীর আলম।

রুমের ভেতরে ঢোকেন সিনিয়র কর্মকর্তা আজমল হোসেন, স্যার কেমন আছেন?

হাসেন আহীর, ভালো আছি। তাকান জামান মিয়ার দিকে, চা দাও আজমলকে। বলো, তোমার খবর?

হাসে আজমল, আছি স্যার একরকম। আপনি আসায় কাজের গতি বাড়বে।

কেন? এতদিন কাজের গতি ছিল না?

ছিল স্যার। কিন্তু জানেনই তো ছাগল দিয়ে হালচাষ করানো যায় না।  মুহিত তো ড্রাফটাই করতে জানে না। ওকে দেওয়া হয়েছে প্রমোশন।

তোমার প্রমোশন তো ডিউ ছিল...

আপনি থাকলে আমি প্রমোশনটা পেতাম,  প্রশাসনের ডিরেক্টরের বাসায় নিয়মিত যায় মুহিত হোসেন।

অফিসের অফিসার নিয়মিত পরিচালকের বাসায় যাবে কেন?

ঠোঁট কামড়ায় আজমল। সামনে চায়ের কাপ রাখে জামান মিয়া। চায়ের কাপ মুখের সামনে নিয়ে আবার টেবিলে নামিয়ে রাখে, মুহিত যায় ওনার বাসার বাজার করে দিতে।

মানে?

মুহিত আমাদের ডিরেক্টরের বাসার সব কাজ করে দেয়। বাজার করে, জমির দলিল রেকর্ড পর্চা ঠিক করে, বাসার পানির কল নষ্ট হলে মিস্ত্রি ডেকে ঠিক করে দেয়। প্রমোশন তো পাবেই...

আহীর আলম জানেন, প্রশাসনের কাজ আজমল হোসেন ভালোভাবে জানে। কিন্তু অফিসের কাজ জানলেই তো হবে না, তেলের ব্যবহারও জানা থাকতে হবে। কখন কাকে তেল মারতে হবে সেই মহার্ঘ মুহূর্তের সন্ধানে থেকে সঠিক সময়ে তেল মারার কৌশলও জানা চাই। কিন্তু সবাইকে এ কাজটা হয় না। রুচি বড়ো একটা ফ্যাক্টর।

স্যার, নেয়ামুলের চাকরি তো আপনিই বাঁচিয়েছেন। সেই নেয়ামুল আপনার বিরুদ্ধে যা তা বলে বেড়ায়।

হাসেন আহীর আলম, কী যে বলো না আজমল! গত মাসেও নেয়ামুল আমার বাসায় গেছে তিন কেজি আপেল নিয়ে। আমি ওকে বকেছি...

ও আপনার বাসায় গেছে? তিন কেজি আপেল নিয়ে?

মাধা নাড়ান আহীর আলম, হ্যাঁ।

আমার বিশ্বাস হয় না স্যার। ও রেস্টুরেন্টে, অফিসের এখানে সেখানে লোকজনের কাছে বদনাম করে আপনার। বলে, আহীর আলম স্যারের জন্য বেতন কম পাচ্ছি প্রতি মাসে।

চাকরিটাই তো থাকত না, যদি আমি ওর পক্ষে স্ট্রং ভূমিকা না নিতাম—

ওর পক্ষে স্ট্রং ভূমিকা নেওয়াটাই আপনার ভুল হয়েছে।

আজমল, তুমি গোটা ঘটনা জান না। দু বছর স্টোরে থাকার সময়ে স্টোরকিপার মকবুলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রায় আট লাখ টাকার হিসেবে গোলমাল করেছে নেয়ামুল আহমদ। আমাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দেন ডিজি। আমরা তদন্ত কমিটির সদস্যরা মিলে এক মাস কাগজপত্র দেখে, স্টোরের জিনিসপত্রের হিসাব করে দেখলাম, টাকা মারার মূল হোতা মকবুল। তদন্ত কমিটির বাকি দুই সদস্য চাইল মকবুলের সঙ্গে নেয়ামুলকেও চাকরিচ্যুত করতে। আমি প্রতিবাদ করে বললাম, স্টোরের প্রধান হিসেবে সব দায় মকবুলের। চাকরি মকবুলের যেতে পারে, নেয়ামুলের নয়। কারণ পিয়ন হিসেবে নেয়ামুল আদেশ পালন করেছে মাত্র। কিন্তু বাকি দুই সদস্য আমার সঙ্গে ভিন্নমত দিলে আমরা যাই ডিজির কাছে। ডিজি সব শুনে বললেন, হ্যাঁ, স্টোরকিপার আর পিয়নের অপরাধ সমান হতে পারে না। কিন্তু নেয়ামুলেরও শাস্তি হওয়া দরকার। কারণ, ওর উচিত ছিল স্টোরকিপারের স্টোরের টাকা আত্মসাতের ঘটনা অফিসকে জানানো।

আমি বললাম, ঠিক বলেছেন স্যার। পোস্ট অ্যান্ড পজিশনের কারণে দুজনের একই শাস্তি হতে পারে না। শেষে স্টোরকিপার মকবুল হলো চাকরিচ্যুত। আর নেয়ামুলের চাকরি বহাল রইল, কিন্তু বেতনের বিশ শতাংশ কেটে রাখার আদেশ জারি হলো। এখন বলো, আমি কি ওর ক্ষতি করেছি?  আহীর আলম তাকান আজমলের দিকে।

কিন্তু ও মনে করে, বিশভাগ বেতন আপনার জন্য পাচ্ছে না।

তুমি ওকে ডাকো। আমি সামনাসমানি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই...

ঠিক আছে স্যার, আমি ফোন দিচ্ছি  নেয়ামুলকে। আজমল ফোন করে নেয়ামুলকে। কয়েকবার রিং হওয়ার পরই রিসিভ করে ফোন, হ্যালো নেয়ামুল তুমি কোথায়?

আমি রুমে আছি স্যার।

আহীর আলম স্যার এসেছেন। তোমাকে ডাকছেন—আজমল মোবাইলের লাউড স্পিকার অন করে দেয়। সবই শুনছেন আহীর আলম।

আমাকে ক্যান ডাকছেন? আমি তো ওনার পিয়ন না।

আরে তোমার এতবড় উপকার করলেন স্যার, কতদিন পর অফিসে এলেন, তোমার তো স্যারের সঙ্গে দেখা করা উচিত।

আজমল স্যার, আপনারে একটা কতা কই। আহীর আলম মিয়ার বাম পায়ের মাংসের মইধ্যে জ্বালা-যন্ত্রণা ক্যান অইচে কইতে পারেন? অইচে আমার আর আমার বউ মাইয়া-পোলার অভিশাপে। হের লাইগাই আমি প্রত্যেক মাসে তিন হাজার টাহা কম পাই। আপনে বোঝেন প্রত্যেক মাসের তিন হাজার টাকা না পাওয়ার কষ্ট!

আরে মিয়া তোমার তো চাকরিই চলে যেত। আহীর স্যার না থাকলে তোমার পক্ষে...

আরে রাহেন। হের লাইগা আমি কম করছি! হাসপাতালে হের পোলা মাইয়া যাইতো না। আমিই হাসপাতালে যাইয়া সেবা করছি না! নেয়ামুলের গলা ফণাতোলা সাপের মতো হিস হিস করে। আমি কি কচি পোলা? কিছু বুঝি না? হেয় যদি ডিজিরে ভালো কইরা কইতো আমার বেতন কাটতো না...

তোমার তো চাকরিই থাকতো না নেয়ামুল। অফিসের সবাই জানে, আহীর স্যারের কারণে তুমি এখনো চাকরি করছো। তিন হাজার টাকা কম পেলেও চাকরি তোমার আছে। অন্যায় করলে শাস্তি হবে না? মকবুলের তো চাকরিই চলে গেছে...

খেপে যায় নেয়ামুল, হোনেন, আমার চাকরি যাওয়া এতো সোজা না। মামলা কইরা দিতাম না? আমার মামায় হাইকোর্টের বড়ো উকিল। তয় আমিও আহীর আলম মিয়ারে ছাড়ুম না।

তুমি কী করবা?

আমি একদিন যাইয়া আহীর মিয়ার বাম পাওডার উপর লোহার রডের বাড়ি দিয়া এক্কেরে ভাইঙ্গা দিমু। হালায় যেন আর আটতে না পারে! আমারে চেনে নাই...। আমি ছাড়মু না...। আজমল হোসেন বন্ধ করে দেয় মোবাইল। কথা আর শোনা যায় না।

লজ্জায় আজমল মাথা নিচু করে বসে থাকে। অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছে। কেন আমি নেয়ামুলের কাছে ফোন করলাম? হাসির শব্দে মুখ তোলে। অবাক ঘটনা, আহীর আলম বাম পায়ের ওপর আদর করতে করতে হাসছেন হাঃ হাঃ শব্দে।

স্যার! চমকে ওঠে আজমল হোসেন, লোকটা পাগল হয়ে গেল?

হাসি থামিয়ে তাকান আহীর আলম, আজমল, আমি আমার বাম পায়ের কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় আমার কাছের মানুষদের চেনার সুযোগ পেয়েছি। দূরের মানুষদের বোঝার সুযোগ পেয়েছি। অফিসের কলিগদের চিনতে পেরেছি। হ্যাঁ, বাম পা আমার শারীরিক যন্ত্রণার কারণ, কিন্তু কৃতজ্ঞও বাম পায়ের অকৃত্রিম যন্ত্রণার কাছে। এইসব প্রাণীদের চরিত্র দেখার একটা সুযোগ করে দিয়েছে আমার যন্ত্রণা মাখা এই বাম পা। যতদিন বাঁচি বাম পায়ের মহান যন্ত্রণা নিয়েই বাঁচতে চাই।