লোকসংস্কৃতি

জারি সারি ও কবিগান

জারি বলতে এমন এক শ্রেণির গান বোঝায়, যে গান অত্যন্ত দীর্ঘ একই ছন্দে রচিত এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় গীত হয়। জারিগান একক কিংবা দ্বৈত গায়কদল গায়। দু’দল গায়ক আসর বসিয়ে এ গান যৌথ কণ্ঠে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পরিবেশন করে। ঐ আসরে জারির অপরিহার্য ধুয়া, পাঁচালি, ছড়া প্রভৃতি। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতিতে কবিগান, জারিগান, সারিগান, যাত্রা, পালাগান, গম্ভীরাগান, গাজী-কালুর গান, লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধাকৃষ্ণ পালা প্রভৃতি এখনো হয়। বর্তমানে সোনারগাঁ কারুশিল্প মেলায় বাউলগান, পালাগান, কবিগান, যাত্রাপালা, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, হাছন রাজার গান, লালনের গান, মাইজভাণ্ডারী, মুর্শিদীগান, আলকাপগান, শরিয়তি-মারফতি গান, লোককবিতা পাঠের আসর, পুঁথিপাঠ, লোকগল্প বলার আয়োজন করা হয়। এতে লোকসংগীতও পরিবেশিত হয়ে থাকে।

গাঁওগ্রামে পালাগানের মাঝে বাঙালির প্রাণের অস্তিত্ব। আর অতীতের কবিগানে মিলনমেলার মজাই ছিল আলাদা। দোকানে বর্ষীয়ানরা বলাবলি করেন। ইতিহাসে থাকবে কবিগান কিন্তু কবির গানে হাট আর বসবে না। গাঁও-গ্রামে প্রবীণদের খোরাক ছিল জনপ্রিয় এ কবিগান। এই কবিগানের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় নেই। বিশেষ করে শীতকালে এইসব গানের আসর রাতভর চলত। কবিগানে থাকে তর্ক আর গানে-গানে পালটাপালটি যুক্তি। দুই কবিয়ালের লড়াইয়ে কবিগান শুরু হয়। তাদের হাতিয়ার হারমনিয়াম, ঢোল, বাঁশি, কাশা, বেহালাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে মুগ্ধ হয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতেন দর্শক-শ্রোতারা। কাছের ও দূরের শত-শত পুরুষ, নারী সারা রাত ধরে এ গান উপভোগ করেন।

প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন জায়গায় পালাগানের আসর বসলেও সোনারগাঁ লোক-কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত লোকজ মেলায় শিল্পী লিপি সরকার, লুতু সরকার, কবির সরকার, আলম দেওয়ান, সাগর দেওয়ান, মারিয়া দেওয়ান, রুবী সরকার, জীবন দেওয়ান, কুদ্দুস বয়াতী, ঝরনা, সাঈদা ইসলাম ও পাগল মনিরের গান উল্লেখযোগ্য। এ গানের আসরকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ মেলাও বসে। পার্শ্ববর্তী উপজেলা মেঘনা থানার গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবেও বড়োসড়ো করে কবিগানের আয়োজন করে থাকেন। কবিগান হারিয়ে যেতে বসেছে। কবিগানে আনন্দ আর উল্লাস নেই। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লোকসংস্কৃতির জারি, সারি, কবিগান রক্ষা করা প্রয়োজন।