দুর্নীতি দমন সংস্থার চেয়ারম্যান নিজ কার্যালয়ে ‘দুর্নীতি দমনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা উদ্বোধনকালে বলিয়াছেন, ‘আজ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রধান অন্তরায় দুর্নীতি। এই দুর্নীতি যতটা কমিয়ে আনা যায় সেটাই হবে মুজিববর্ষে আমাদের জন্য সবচেয়ে উত্তম কাজ।’ প্রশ্ন হইল, তাহার এই আশাবাদ বিদ্যমান বাস্তবতায় কতটা পূরণ হইতে পারে?
দুদক চেয়ারম্যান নিঃসন্দেহে সজ্জন মানুষ। তাহার সদিচ্ছা অথবা সাহসের কমতি নাই। দেশব্যাপী তাহার ইতিবাচক ভাবমূর্তি রহিয়াছে। দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টাতেও তাহার রহিয়াছে তারুণ্যের মতো স্পৃহা। দুর্নীতি দমনের মতো কর্মে তাহার মতো উপযুক্ত মানুষ মিলা ভার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাহাকেও অসহায় মনে হইতেছে। আমরা প্রায়শই দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের মতো দৃঢ় চরিত্রের মানুষের কণ্ঠে দুর্বলতা ভাসিয়া উঠিতে দেখি। তাহার কারণও আমরা বুঝি। দুর্নীতি কোথায় নাই, কোন সেক্টরে নাই? সর্বক্ষেত্রে যে দুর্নীতি ছাইয়া গিয়াছে তাহা এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষটি অনুধাবন করিতে পারিতেছেন। তাহার হাত কতটা লম্বা ইহা লইয়া সন্দেহের অবকাশ রহিয়াছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কমিশন তাহার নেতৃত্বে সোচ্চার। কিন্তু কাহারা এই অভিযানের শিকার এবং কাহারা এই অভিযানের ঊর্ধ্বে উঠিয়া আছেন, তাহা চোখ খুলিয়া দেখিবার বিষয়। একজন ব্যক্তি কয়েক হাজার ডলার লইয়া চিকিত্সার জন্য দেশের বাহিরে গেলে দুর্নীতি দমন সংস্থা তাহাকে হাতে পাইলেই চাপিয়া ধরিতেছে। কিন্তু যিনি দেশ হইতে বিলিয়ন ডলার বাহির করিয়া লইয়া যাইতেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রে অথবা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে প্রাসাদ গড়িয়া তুলিতেছেন, এমন কয়জন লোকের নাগাল পাইয়াছে দুদক? অথচ ঐ সকল ব্যক্তিকে দুদক চিনে না অথবা তাহাদের কর্ম সম্পর্কে দুদক একেবারেই অবগত নহে—ইহা বলিলে জনগণের নিকট তাহা অস্বাভাবিক বলিয়া মনে হইবে।
অতএব, সত্যিকারে দুর্নীতি যদি নিয়ন্ত্রণ করিতে হয়, তাহা হইলে ঐ সকল ব্যক্তিকে স্পর্শ করিতে হইবে যাহারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে বলিয়া ভাবিতেছেন, যাহাদের অর্থপাচার সম্পর্কে সাধারণ মানুষও ধারণা রাখে। অধিকন্তু এই গুটিকয়েক ব্যক্তি ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া গেলে জনগণের মধ্যেও দুদকের অভিযানের প্রতি আস্থা তৈরি হইবে না। মনে রাখিতে হইবে, জাল ফেলিয়া বড়ো মাছ ধরিতে চাহিলে তাহার সঙ্গে চুনোপুঁটিও জালে উঠিয়া আসে। মাত্র কয়েকটি রুই-কাতলা টাইপের দুর্নীতিবাজ ধরিলে ছোটোখাটো দুর্নীতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়া যাইবে। নিশ্চয়ই আমরা তাহার এবং তাহার প্রতিষ্ঠানের সফলতা কামনা করি। কিন্তু সফল হইতে হইলে নজর দিতে হইবে সমাজের সকল স্তরেই। মোদ্দা কথা, মনে রাখিতে হইবে যে, মাত্র গুটিকয়েক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দিক হইতে দৃষ্টি সরাইয়া রাখিলে বা সরাইয়া রাখিতে বাধ্য হইলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ সুদূর পরাহতই থাকিয়া যাইবে।