‘বড়াল’ নামে এক নদী ছিল

উত্তর জনপদের অন্যতম নদী বড়াল। এককালের জীবন্ত এই নদীটিকে খুন করা হয়েছে তিলে তিলে। চলন বিলের এই প্রধান নদীকে এক সময় ‘বড়হর’ অর্থাত্ পদ্মার বড়ো হাওর বলা হলেও আজ পানিশূন্য মৃত খাল। পদ্মা-যমুনার মিলন ধারার সেতুবন্ধ এ বিশাল নদীর প্রায় এক চতুর্থাংশ জায়গা অনেক আগেই দখল হয়ে গেছে। দখলকৃত বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে বাড়িঘর, সরকারি-বেসরকারি অফিস নির্মাণ ও হাউজিং প্লট তৈরি করেছেন প্রভাবশালীরা। নদীর ওপর দিয়ে ক্রমাগত বাঁধ, স্লুইসগেট, ক্রসবাঁধ নির্মাণ করায় এর গতি রুদ্ধ হয়ে গেছে। অপরদিকে নদী-তীরবর্তী আটটি পৌরশহরের অগণিত পোলট্রি ফার্ম, আটটি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক, হোটেল, কলকারখানা, বসত-বাড়ির বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনে মৃত প্রায় বড়াল দূষিত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। 

এককালের প্রমত্তা বড়াল রাজশাহীর চারঘাট এলাকায় পদ্মা নদী থেকে উত্পন্ন হয়েছে। এ নদী নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে চলনবিল প্লাবিত করে প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হুরাসাগরে মিলিত হয়ে যমুনা নদীতে পড়েছে। বড়ালের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২০ কিলোমিটার, প্রস্থ ২৩০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার। কোথাও আরো সরু এবং আরো প্রশস্ত। এক সময় এ নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল চলনবিলে প্রবহমান মুসাখাঁ, নারোদ, নন্দকুজা, চিকনাই, ও গুমানীসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদী এবং নদী-তীরবর্তী প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। বড়াল নদী চার জেলার ১০টি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও পুরো চলনবিল অঞ্চলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে আরো ২০টি উপজেলায় এই নদীর প্রভাব আছে। দেশের বৃহত্তম দুটি নদী পদ্মা ও যমুনা এবং বৃহত্ জলাভূমি চলনবিলের মধ্যে প্রধান সংযোগ রক্ষাকারী নদী বড়াল।  এ নদীর সঙ্গে যুক্ত আছে প্রায় শতাধিক খাল। একেকটি খালের সঙ্গে যুক্ত আছে চার-পাঁচটি করে বিল। এ কারণে বড়ালের অববাহিকায় নানা স্থানে প্রতিবন্ধকতার কারণে পানির প্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় চলনবিলের অধিকাংশ বড়ো বড়ো নদ-নদীতে নাব্য-সংকট চরম হয়ে দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজশাহীর চারঘাটে বড়ালের উত্সমুখে নদী শাসন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশাল স্লুইসগেট নির্মাণ করেছে। বনপাড়া এলাকায় প্রায় ১৮ কি. মি. বড়াল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাবনা নাটোর মহাসড়ক নির্মাণ করা হয় বনপাড়ায় বড়ালকে শাসন ও সংকীর্ণ করে ফিসফাস ব্রিজ নির্মাণ করে। বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ার উজানে রামাগাড়ী এলাকায় নির্মিত স্লুইসগেটের কারণে খরা মৌসুমে ভাটিতে বড়াল পানিশূন্য হয়ে পড়ত। এটাকে মওকা করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদী ভরাট করে বসতবাড়ি, মার্কেট, হাউজিং প্লট স্থাপন করেন। এছাড়া এখানে সরকারি বেসরকারি অফিসের পাকা ভবনও নির্মাণ হয়েছে।

বিকল্প পথে আটঘরির পরে নন্দকুজা হয়ে বড়াল প্রবাহ একই জেলার গুরুদাসপুরের কাছে আত্রাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গুমানী নামে নদীটি ভাটিতে এসে পাবনা জেলার ভাংগুরা ও চাটমোহরের সন্নিকটে নুরনগর বা শাহনগর দুই ভাগে ভাগ হয়ে একটি ধারা চাটমোহরে বড়ালের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভাংগুরা ও ফরিদপুরে প্রবাহিত হয়। ফরিদপুর উপজেলার নারায়ণপুরে গুমানী ও বড়াল পুনরায় মিলিত হয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার দক্ষিণ সীমান্ত ও বেড়া উপজেলার উত্তর সীমন্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হুরাসাগরে মিশে যমুনায় পতিত হয়েছে।

বড়াল মরে গেছে প্রায় ২০ বছর আগে।  নদীকে ঘিরে এই এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা ছিল সুখ-সমৃদ্ধির। বড়াল মরে যাওয়ায় এলাকার মত্স্যজীবীদের দুর্দিন যাচ্ছে। বড়াল রক্ষার তাগিদে ২০০৮ সালের ২ আগস্ট গঠিত হয় বড়াল রক্ষা আন্দোলনের একটি কমিটি। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সম্প্রত নুরনগর, দহপাড়া, চাটমোহর নতুন বাজার, বোথর ও রামনগর ক্রশ বাঁধ অপসারণ হয়েছে। পদ্মা-যমুনার সঙ্গেই বড়াল নদীকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় আনার দাবি করেন বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা। বড়ালে জমে থাকা কচুরিপানা অপসারণ করতে হবে, মানুষের নদী মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। 

n লেখকদ্বয় : সাংবাদিক