গেজেটভুক্ত বনভূমিতে শিপইয়ার্ড নয় :হাইকোর্ট

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল গেজেটভুক্ত বনসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু ওই নির্দেশনা আমলে নেয়নি জেলা প্রশাসন। আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার উত্তর সলিমপুর মৌজায় বিবিসি স্টিল লিমিটেডের অনুকূলে সাত একর বনভূমি জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য ইজারা দিয়ে চুক্তিনামা করে। গতকাল বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট এক রায়ে ওই চুক্তিনামা অবৈধ ঘোষণা করেছে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলিরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ে বন আইনের ৪ ধারায় গেজেটভুক্ত কোনো বনভূমি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের অনুকূলে ইজারা প্রদান না করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এই আইনের অধীনে গেজেটভুক্ত সব বনভূমি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। হাইকোর্ট বলেছে, সংরক্ষিত বনের জন্য চিহ্নিত বনভূমি এবং সংরক্ষিত বনে কোনো ধরনের জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম জেলার এক লাখ ৬৫ হাজার একর সমুদ্র সিকস্তি চরভূমি বনায়নের জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর সরকার এই পরিমাণ বনভূমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণার লক্ষ্যে বন আইনের ৪ ধারায় গেজেট প্রকাশ করে। এই ৪ ধারায় বলা হয়েছে, রিজার্ভ ফরেস্ট (সংরক্ষিত বন) ঘোষণার জন্য সরকার একটি গেজেট জারি করবে। এরপর বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পাদনের পর ওই আইনের ২০ ধারায় সংশ্লিষ্ট বনের নির্দিষ্ট ভূমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়ে থাকে।

এ লক্ষ্যে ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে উত্তর সলিমপুর মৌজায় বন বিভাগ ৪০০ একর ভূমিতে বনায়ন করে। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগ এক রায়ে গেজেটভুক্ত কোনো বনভূমি তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ ব্যবহার না করা এবং জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপনে ইজারা না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে রায় দেয়। কিন্তু এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বিবিসি স্টিলের অনুকূলে ওই মৌজার ৪০০ একর ঘন ম্যানগ্রোভ বনের ৭ দশমিক ১০ একর বনভূমি জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য একটি চুক্তিনামা স্বাক্ষর করে। গত ২১ মার্চ ওই চুক্তিনামা এক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়। নবায়নের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি  (বেলা)। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৩ মে হাইকোর্ট ওই বনভূমিতে ইয়ার্ড নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একই সঙ্গে ওই চুক্তিনামা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। রুলের ওপর রিটকারী পক্ষে অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও সাঈদ আহমেদ কবীর শুনানি করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট উপরিউক্ত রায় দেয়।

রায়ে হাইকোর্ট বলে, বিবিসি স্টিল লিমিটেডের অনকূলে জেলা প্রশাসন কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিনামা আপিল বিভাগের রায়ের পরিপন্থি। ফলে ওই চুক্তি শুরু থেকেই অবৈধ ঘোষিত হলো। একই সঙ্গে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো এফিডেভিট দাখিল না করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে আদালত। অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, হাইকোর্টের এ রায়ের ফলে বন আইনের ২০ ধারায় চূড়ান্ত ঘোষিত হয়নি—এমন বনভূমিতে কোনো ধরনের প্রকৃতি বিরুদ্ধ ব্যবহারের পথ রুদ্ধ হলো।