মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন, বকেয়া মজুরি-বেতন পরিশোধসহ ১১ দফা দাবিতে পাটকলের শ্রমিকদের অনশন ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। তীব্র শীতের মধ্যে অনশনে কয়েক জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অনেকে স্যালাইন লাগিয়ে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবু দাবি না আদায় হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ইত্তেফাকের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
খুলনা অফিস জানায়, দাবি আদায়ের জন্য পাটকলের শ্রমিকদের স্ত্রী-সন্তানরাও মাঠে নেমেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের ডাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের অনশন কর্মসূচির পঞ্চম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যরাও যোগ দেয়। এদিকে কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর কে ডি ঘোষ রোডে দলীয় কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
খুলনার প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, ইস্টার্ন, আলিম, ক্রিসেন্ট জুট, জেজেআই ও কার্পেটিং মিলের শ্রমিকেরা নিজ নিজ মিলগেটে এবং স্টার জুট মিলের শ্রমিকেরা খালিশপুর বিআইডিসি সড়কে গতকাল বৃহস্পতিবার পঞ্চম দিনের মতো অনশন কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা নগরীর নতুন রাস্তার মোড়ে অবস্থান নেওয়ায় খুলনা-যশোর রুটে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনরত শ্রমিকেরা জানান, খুলনার সাতটি পাটকলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। সব কয়টি মিলেই শ্রমিকদের ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতিতে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনশন চলাকালে বুকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ১০-১১ বছরের এক শিশু। তাতে লেখা, ‘আমি শ্রমিকের সন্তান, আমার বাবা মজুরি না পাওয়ায় আমরা না খেয়ে মরতে বসেছি। টাকার অভাবে পড়ালেখা করতে পারছি না। আমার বাবাকে বাঁচাও, মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন চাই, ঠিকমতো লেখাপড়া করতে চাই।’
পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক মুরাদ হোসেন বলেন, সাতটি পাটকলের প্রায় ২০ হাজার স্থায়ী শ্রমিক এই অনশনে অংশ নিয়েছেন। টানা অনশনে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা শরীরে স্যালাইন নিয়ে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, টানা পাঁচ দিনের অনশনের কারণে রাজশাহীর চার পাটকল শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ঐ শ্রমিকদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকালে শ্রমিকদের স্ত্রী-সন্তানরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন। পরিষদের সভাপতি জিল্লুর রহমান জানান, তীব্র শীত উপেক্ষা করে তারা শান্তিপূর্ণভাবে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, পঞ্চম দিনের মতো আমরণ অনশন করেছেন নরসিংদীর ইউএমসি জুট মিলের শ্রমিকেরা। তীব্র শীত উপেক্ষা করে রাতভর অনশনস্থলে অবস্থান করেন তারা। পঞ্চম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে অনশন করেছেন তারা। বেলা ১১টায় তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ইউএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থী ইউএমসি জুট মিলের শ্রমিকদের সন্তান। এছাড়া নারীসহ শ্রমিকদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যও অনশনস্থলে অবস্থান করেন। অনশনে চার জন শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের সেখানে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকেরা জানান, বৈঠক ডাকা হলেও আমরণ অনশন চলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত মজুরি কমিশনসহ ১১ দফা দাবি বাস্তবায়নের লিখিত কোনো আশ্বাস না মিলবে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, গতকাল সন্ধ্যায় আমিন জুট মিল গেইটে অনশনের সময় পাটকল শ্রমিক মো. শাহাদাত হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের স্ত্রী সন্তানরাও অনশনস্থলে এসে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন। তারা দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান।