বাংলাদেশে স্থানীয় প্রশাসনে নানা সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে; প্রশাসকদের নানা বাধা অতিক্রম করিয়া জনগণের সেবা প্রদান করিতে হয়। তাহাদের মোকাবিলা করিতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলকে। সমাজ ও রাজনীতির নানা স্তরে বিদ্যমান যেই ক্ষমতাকাঠামো তাহার সঙ্গে বুঝিয়াশুনিয়াই তাহাদের কার্যক্রম চালাইয়া যাইতে হয়। কাজটা আরো কঠিন হইয়া উঠে যখন প্রশাসনে লোকবলের ঘাটতি দেখা দেয়। এক হিসাবে, বর্তমানে সারাদেশে প্রশাসনে প্রায় সোয়া তিন লক্ষ লোকবলের ঘাটতি রহিয়াছে। এই বিপুল পরিমাণ লোকবলের ঘাটতি যে প্রশাসনকে ধীর করিয়া দেয় তাহা বলাই বাহুল্য। ইহার ফলে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান করা দুরূহ হইয়া পড়ে। তেমনি পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায়। সেইখানে উপজেলা প্রশাসনে সর্বমোট ৫০টি পদ শূন্য। একটি উপজেলায় কতটি পদ থাকে যে তাহার মধ্যে ৫০টি পদই শূন্য, তাহা ভাবিয়া আমাদের বিস্মিত হইতে হয়। আর অবধারিতভাবে ইহার ফলে স্থানীয় জনগণ পড়িয়াছেন ভোগান্তিতে। জানা গিয়াছে, উক্ত উপজেলায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ৩৩ কর্মকর্তাসহ অর্ধশত পদ শূন্য থাকায় কাজকর্ম ব্যাহত হইতেছে। এই উপজেলায় ১৭টি সরকারি দপ্তর রহিয়াছে। ইহার মধ্যে উপজেলা প্রকৌশলী, সমবায় কর্মকর্তা, খাদ্য নিয়ন্ত্রক, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন ধরিয়া শূন্য রহিয়াছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানাইয়াছেন, প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের এই উপজেলায় ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনিসহ মাত্র ছয় জন চিকিত্সক কর্মরত রহিয়াছেন। অথচ ৮ বিশেষজ্ঞসহ ২১ চিকিত্সক থাকিবার কথা। ফলে নিশ্চিতভাবেই সেখানকার জনগণ উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছে। এতগুলো চিকিত্সকের শূন্য পদ লইয়া স্বাস্থ্য কেন্দ্র চলিতে পারে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকসহ অন্যান্য লোকবল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জানাইয়াছেন, তাহার দপ্তর হইতে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতাসহ সরকারের ২২ ধরনের প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের ১৮টি পদের মধ্যে ৯টি পদ দীর্ঘদিন ধরিয়া শূন্য পড়িয়া রহিয়াছে। ইহার ফলে তাহার অধিদপ্তরের কাজকর্ম পরিচালনা করিতে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইতেছে।
ইহা কেবল একটি উপজেলার চিত্র নহে বরং সারাদেশের অধিকাংশ স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থা এইরূপ। যে সোয়া তিন লক্ষ লোকবলের ঘাটতি রহিয়াছে তাহার সমাধান না করিলে এই সংকট হইতে মুক্তি মিলিবে না। বাংলাদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে নিয়োগ দিয়া থাকে সরকারি কর্ম কমিশন, বাকি নিয়োগ দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় হইতে। ফলে সরকারি কর্ম কমিশনকে আরো তত্পর হইতে হইবে; প্রয়োজনে লোকবলের বৃদ্ধি ঘটাইয়া কমিশনকে ভাগ করিয়া দিতে হইবে যাহাতে তাদের কাজে গতি আসে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হইতে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করিতে যাইতেছে। কিন্তু ইহার সহিত যে গতিশীল ও বেগবান প্রশাসনিক কাঠামো দরকার তাহা এখনো নিশ্চিত করা যায় নাই। আমরা আশা করিব, লোকবলের ঘাটতি পূরণের মধ্য দিয়া প্রশাসন দক্ষ ও সত্যিকারের জনবান্ধব হইয়া উঠিবে।