পর্যটনশিল্প উন্নয়নে ব্যাংকও ভূমিকা রাখতে পারে

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

আবহমান বাংলার সবুজ প্রকৃতির অপরূপ বৈচিত্র্যের নৈস্বর্গিক লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বিশ্ব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ অনেকটাই পেছনে ফেলেছে ভারত ও পাকিস্তানকে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪।

ইতিমধ্যে পর্যটন বিশ্বব্যাপী একক বৃহত্তম শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পর্যটনশিল্পের নতুন নতুন পর্যটন গন্তব্য চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সেসব স্থানে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যর প্রসার, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানিযোগ্য শিল্পপণ্য হিসেবে জ্বালানি ও রাসায়নিক শিল্পপণ্যের পরেই তৃতীয় সারিতে উঠে এসেছে পর্যটন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৯৮ লাখ মানুষ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে দেশি-বিদেশি সব ধরনের পর্যটক রয়েছেন। দিনে দিনে বাংলাদেশে পর্যটনে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দারুণ সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পর্যটনশিল্প। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটনশিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আশারূপ না বাড়লেও, ধীরগতিতে বিদেশি পর্যটকও বাড়ছে।

আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটন শিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের পর পর্যটন শিল্প হতে পারে রাজস্ব আদায়ের বিরাট সম্ভাবনাময় একটি খাত। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাত জিডিপিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। ডব্লিউটিটিসির গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন খাতের সঙ্গে সংম্পৃক্ত। সবমিলিয়ে পর্যটন খাত প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অনেক প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা, সমস্যা, সংকট, ত্রুটি-বিচ্যুতি আর পশ্চাত্পদতা সত্ত্বেও পর্যটন খাত থেকে  একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ অর্জন করছে বাংলাদেশ।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ এ বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পর্যটন দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল—‘ভবিষ্যতের উন্নয়নে, কাজের সুযোগ পর্যটনে’ যা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, সুপরিকল্পনা, দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে দেশের পর্যটনশিল্প উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিত উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ট্যুর অপারেটরেদের দাবি, এ খাতে আরো সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে সরকার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগ আগ্রহী অনেক উদ্যোক্তা যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজির অভাবে মাঝপথে থেমে আছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার, যা সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় অপ্রতুল। প্রয়োজনে আর্থিক সহযোগিতা যেমন ব্যাংক ঋণ পেলে তারা তাদের পরিকল্পনাগুলোকে আরো সুন্দর ও বাস্তবমুখীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম, আলাদা ঋণদানের মাধ্যমে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিনিয়োগের বিশেষ প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ নেয়, তাহলে পর্যটন খাতে খুব দ্রুত সমৃদ্ধি ঘটবে। ব্যাংক ঋণ পেলে গড়ে উঠবে আরো আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট, সেখান থেকে আয় হতে পারে বিপুল পরিমাণ অর্থ। পর্যটনশিল্পকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতো একটি বিশেষায়িত ব্যাংক চালু করা যেতে পারে। বর্তমানে সার্কভুক্ত দেশ নেপাল পর্যটন খাতে আকাশছোঁয়া সাফল্য অর্জন করছে। নেপাল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, নেপালের পর্যটন খাতে বিশাল সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পর্যটন খাতে আর্থিক বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ ভেবে সংকুচিত অবস্থায় আছে তাই পর্যটনভিত্তিক একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে হোটেল, মোটেল, কটেজ, রিসোর্ট প্রতিষ্ঠা, ক্রয়, সংস্কার, পুনঃসজ্জিতকরণ, আধুনিকায়নে ঋণ বিতরণ এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে সঠিক নির্দেশনা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে পর্যটনশিল্পকে আরো সমৃদ্ধিশীল করতে পারবে।

নেপালের মতো ভারতও পর্যটন খাতে আর্থিক সহযোগিতার জন্য রয়েছে ট্যুরিস্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়া, যা ভারতের পর্যটনশিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে। পর্যটনভিত্তিক বিশেষায়িত ব্যাংক ছাড়াও আরো একটি বিকল্প ব্যবস্থা হলো—বাংলাদেশে প্রচলিত সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো যদি পর্যটনশিল্পের বিকাশে নতুন শাখা তৈরি করে বিনিয়োগ করে তাহলেও তা পর্যটনশিল্পকে নতুন একটি রূপ দিতে সক্ষম হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠনগুলো, এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ঋণের মতো আলাদা ঋণদান কর্মসূচি প্রচলন করতে পারে। দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র ও স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিশেষ ট্যুরিজম ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করা যেতে পারে। ব্যাংকগুলো পর্যটন ক্ষেত্রেগুলো সম্ভব্যতা যাচাই ও বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ উপযোগী মনে হলে ট্যুরিজম ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করার মাধ্যমে ঋণসুবিধা প্রদান করতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে পর্যটকদের চলাচলে সুবিধার জন্য বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে নানা ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা তাদের সেবার পরিধি ও মান বৃদ্ধি করতে পারে। বিলাসবহুল বাস, ট্যুরিস্ট কোচ ও জাহাজ আমদানির লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো যথাসম্ভব জটিলতা পরিহার করে সহজ শর্তে ট্যুরিস্ট অপারেটরদের পর্যাপ্ত ঋণ প্রদান করতে পারে।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মুদ্রাবিনিময়ের জন্য সার্বক্ষণিক ব্যাংকিং সেবা প্রদানের ব্যবস্থা, যথেষ্ট পরিমাণে এটিএম বুথ স্থাপন, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন এবং হেল্পডেস্ক সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো যে অর্থ ব্যয় করে, তার একটি অংশ দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে এ মর্মে সিএসআর ব্যয় নীতিমালা সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক—যা খুবই প্রশংসনীয়। নিয়ম অনুযায়ী, একটি ব্যাংকের মোট বার্ষিক মুনাফার আড়াই শতাংশ সিএস আরে খরচ করতে হয়। পর্যটন খাতকে চাঙ্গা ও উন্নত করতে স্পেশাল ট্যুরিজম ব্যাংকিং কর্মসূচি চালুর ব্যাপারে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যদি আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়, তাহলে সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পকে আরো সমৃদ্ধ ও উন্নত করা সম্ভব।

বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটনশিল্প থেকে প্রতি বছর ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫১টি দেশের পর্যটকেরা বাংলাদেশে ভ্রমণ করবে যা মোট জিডিপির ১০ শতাংশ অবদান রাখবে। লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব এই শিল্পে বিনিয়োগের অনেক সুযোগ থাকলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ খাতে অংশগহণ এখনো উল্লেখ করার মতো অবস্থায় পৌঁছেনি। তাই সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পকে আরো উন্নত ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ ব্যাংকিং সেবা চালু এবং আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। কেননা, বাংলাদেশ পর্যটনশিল্প যদি আরো উন্নত হয় তাহলে তা অর্থনৈতিক অবস্থায় এবং মোট জিডিপিতে বিপুল পরিমাণে অবদান রাখতে পারবে।

একুশ শতককে বিশ্বব্যাপীই পর্যটনের স্বর্ণ সম্ভাবনা ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো সম্ভাবনাময় শিল্পকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বাহন হিসেবে নিতে হলে তার বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যার দরকার। ডব্লিউটিটিসির গবেষণায় মতে, বিশ্বের ১৮৪টি পর্যটন সমৃদ্ধ দেশের মধ্যে বাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬০ নম্বরে। দশ বছর পর বাংলাদেশ ১৮তম অবস্থানে চলে আসবে। ফলে জাতীয় আয়ে বড়ো অবদান রাখবে এ শিল্প। এ জন্য দরকার পর্যটনশিল্পে দ্রুত বিনিয়োগ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কাজ করতে হবে সবাইকে। অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইকো-সিস্টেম, আবাসস্থল, মানসম্মত খাদ্য, নিরাপত্তা ও ইমেজ বৃদ্ধি করা গেলে দেশে পর্যটক আগমনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং এ খাত থেকে অধিক রাজস্ব আয় অর্জন সম্ভব হবে।

n লেখক :চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়