ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের শীর্ষ জেনারেলকে হত্যা

ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডসের অভিজাত বাহিনী কুদ’স ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানি ইরাকে নিহত হয়েছেন। শীর্ষ এই জেনারেল ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পর সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। ইরানও সোলেইমানির নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও নিন্দার ঝড় উঠেছে। জাতিসংঘ, রাশিয়া, চীন ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে এই হত্যার কঠোর সমালোচনা করেছে ও একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার আশংকা করছে। খবর বিবিসি, ডেইলি মেইল ও সিএনএনের

যেভাবে হামলা

ইরানের টেলিভিশন জানিয়েছে, বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে হওয়া এক হামলায় মারা যাওয়া বেশ কয়েকজনের মধ্যে কাসেম সোলেইমানি রয়েছেন। একইসঙ্গে নিহত হয়েছেন দেশের প্যারামিলিটারির সহকারী প্রধান আবু মাহদি আল মুহানদিস। ইরানের মদতপুষ্ট ইরাকি জঙ্গি গোষ্ঠী কায়তাব হিজবুল্লাহর সংগঠকও ছিলেন মুহানদিস। গতকাল শুক্রবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন থেকে সোলেইমানিসহ অন্যদের বহনকারী দু’টি গাড়ি লক্ষ্য করে চারটি মিসাইল হামলা চালানো হয়। এতে সবার দেহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মুহানদিসের মৃতদেহ চিহ্নিত করা যায়নি। ইরানের এক শীর্ষ রাজনীতিক জানিয়েছেন, সোলেইমানির পরিচয় নিশ্চিত করা হয় তার হাতের আঙ্গুলে পরিহিত আংটি দেখে। এর আগে স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১২ টায় সিরিয়া অথবা লেবানন থেকে সোলেইমানি বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তিনি মুহানদিসসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তাদের বহনকারী গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডসও জেনারেল সোলেইমানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ইরাকে জানাযা শেষে সোলেইমানির মরদেহ আজ শনিবার ইরানে নেওয়া হবে। তার মরদেহ শিয়াদের পবিত্র শহর কারাবালা ও নাজাফে নেওয়া হবে। রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি জানিয়েছে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কানি কুদস ফোর্সের নতুন প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানির (৬২) স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তিনি।

রেভ্যুলিউশনারি গার্ড জানিয়েছে, তাদের ৫ সদস্যসহ মোট ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহত অন্যরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন জাফারি নিয়ে, মেজর জেনারেল হাদি তারেমি, কর্ণেল শাহরুদ মোজাফফারি নিয়ে, ক্যাপ্টেন ওয়াহিদ জামানিয়ান, ইরাক ভিত্তিক পিপলস মোবিলাইজেশন ফোর্সের ডেপুটি কমান্ডার আবু মাহাদি আল মুহান্দিস ও তার জামাতা, মোহাম্মদ আল শিবানি, হায়দার আলি, মুহাম্মদ রেজা আল-জাবেরি এবং হাসান আব্দুল হাদি।  

  

হামলা যে কারণে

পেন্টাগন এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশে অবস্থান করা মার্কিনীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনাবাহিনী এক অভিযানে জেনারেল সুলেইমানিকে হত্যা করেছে। ড্রোন থেকে মিসাইল হামলা চালানো হয়েছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়। পেন্টাগনের দাবি, বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন জেনারেল সোলেইমানি। ইরানের ভবিষ্যত আক্রমণের পরিকল্পনা বানচাল করতে এই হামলা চালানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ অভিযান ও প্যালেস্টিনিয়ান ইসলামি জিহাদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন করতে ইরানের প্রাথমিক অস্ত্র কুদ’স ফোর্স। এসব সংগঠনকে তারা অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে বলে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ড ও তাদের অধীনস্থ কুদ’স ফোর্সকে গত বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। উল্লেখ্য, সোলেইমানি ইসরাইলের মাথা ব্যথার কারণ ছিল। আর মার্কিন ফরেন পলিসির জরিপে সোলেইমানিকে বিশ্বের এক নম্বর জেনারেলের খেতাব দেওয়া হয়েছিল।

চরম প্রতিশোধ নেবে তেহরান

ইরানের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জেনারেল সোলেইমানি। তার কুদ’স বাহিনী সরাসরি দেশটির প্রধান নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে রিপোর্ট করে। খামেনির পর জেনারেল সোলেইমানিকে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হতো। খামেনি বলেছেন, হামলার পেছনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নেওয়া হবে। জেনারেল সোলেইমানির মৃত্যুতে তিন দিনের জাতীয় শোকও ঘোষণা করেছেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের হঠকারিতার ফল ভোগ করবে। রেভ্যুলিউশনারি গার্ডসের সাবেক কমান্ডার মোহসেন রেজায়েই বলেছেন, ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধ নেবে। ইরান সরকারের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, শুক্রবারই দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বসার কথা।

ইরানের মিডিয়ায় সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধে সোলেইমানির অবদানের প্রশংসা করা হয়। জেনারেল সোলেইমানির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশে ইরানের অনেকগুলো টিভি চ্যানেল তাদের স্ক্রিনের উপরের বাম পাশে কালো ব্যান্ডের চিত্র প্রদর্শন করেছে। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হয়েছে পার্সিয়ান ভাষায় লেখা ‘হ্যাশট্যাগ হার্শ ভেঞ্জেন্স’ বা নির্মম প্রতিশোধ। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে গতকাল।

জাতিসংঘ, রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের সমালোচনা

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউএন র্যাপোর্টিয়ার অগনেস কালামার্দ এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘টার্গেটেড কিলিং’ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা সোলেইমানিকে হত্যার উদ্দেশ্যে মার্কিন অভিযানকে অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে মনে করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবসময়ই জোর প্রয়োগের বিরোধী চীন। তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত পক্ষ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে শান্ত থাকতে ও সংযম অনুশীলনে অনুরোধ করবো আমরা, যাতে অস্থিরতা বৃদ্ধি না পায়। ইরাকের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই হামলা ইরাকে মার্কিন সৈন্য অবস্থানের জন্য করা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এছাড়া তুরস্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, সিরিয়া, হামাস, হিজবুল্লাহ ও ন্যাটো হামলার নিন্দা জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা থেকে সবাইকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোলেইমানিকে হত্যার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন।

মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে বিভক্তি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, সোলেইমানিকে আরো কয়েক বছর আগেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ওই জেনারেল হাজার হাজার মার্কিন নাগরিকের হত্যার জন্য দায়ী। আরো অনেক মার্কিন নাগরিককে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইরান ও ইরাকের মানুষের উচিত এই পদক্ষেপকে তাদের স্বাধীনতার উদ্যোগ হিসেবে দেখা। তার মৃত্যুতে বিশ্ব আজ আগের চেয়ে বেশি নিরাপদ।

ডেমোক্র্যাট দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হামলা ও ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেছেন যে ‘খড়কুটোর বাক্সে ডায়নামাইট’ ছুঁড়ে ফেলেছেন ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড়ো ধরণের একটি সংঘাতের মুখোমুখি পড়তে পারে ওয়াশিংটন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক পরিচালক জেমস ক্ল্যাপার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ঐ অঞ্চলে থাকা আমেরিকানরা হুমকির মুখে পড়বেন। তবে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, তিনি হামলা সম্পর্কে আগেই জেনেছিলেন। এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরো ৩ হাজার সৈন্য পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সরকারের নির্দেশনার পর গতকালই ইরাক ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন মার্কিন তেলকর্মী। তারা বসরার বিদেশি তেল কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। ইরাকের পাশাপাশি বাগরাইন, কুয়েত, পাকিস্তানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের জারি করা সতর্ক বার্তায় চলাচল সীমিত করতে বলা হয়েছে। নিউইয়র্ক ও লস এঞ্জেলেসের পুলি সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নজরদারি করছে।