বই চুরির রহস্য

রম্য গল্প

 বিশ্বজিত্ দাস

 

‘রিয়া আপু, আসব?’ দরজায় দাঁড়িয়ে জানতে চাইল চুমকি।     রিয়া বিছানায় শুয়ে হেডফোনে গান শুনছিল। আওয়াজ শুনে কান থেকে হেডফোন খুলল। চুমকি একাদশ বিজ্ঞানে পড়ে। রিয়া এবার এইচএসসি পরীক্ষার জন্য টেস্ট দিচ্ছে। একই মেসে থাকে ওরা। বিছানার ওপর উঠে বসল রিয়া।

‘এসো চুমকি, কী হয়েছে?’

‘আপু, আপনি কি আমার ফিজিক্স বইটি রুম থেকে নিয়ে এসেছেন?’

চোখ পিটপিট করল রিয়া। ‘আশ্চর্য! আমি কেন তোমার বই নিয়ে আসব!’

‘না মানে, এর আগে আপনি তো আমার বাংলা ব্যাকরণ বইটি না বলে নিয়ে এসেছিলেন, তাই জানতে চাইলাম। ফিজিক্স বইটি পাচ্ছি না তো।’

‘বই খুঁজে পেলে না অমনি ভেবে নিলে আমি নিয়ে এসেছি! আশ্চর্য!’ গলা চড়িয়ে বলল রিয়া।

‘আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন আপু। এর আগে তো সাদিয়ার মোবাইল আপনি লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাই বলছিলাম...’

‘আশ্চর্য! সাদিয়ার মোবাইল আমি কেন লুকাতে যাব। ওর মোবাইলটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। মালিক কে, সেটা বোঝার জন্যই তো আমি মোবাইলটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমি কেন অন্যের মোবাইলের ওপর লোভ দেখাব! আমার কি মোবাইল ফোন নেই! আমার বাবার কি টাকার অভাব!’

‘আপনার বাবার টাকার অভাব নেই হয়তো কিন্তু আপনার অভাব আছে মনে হয়।’ কোমরে হাত রেখে বলল চুমকি।

‘দেখ চুমকি, তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।’ গলা চড়ে গেল রিয়ার। তার আওয়াজ শুনে পাশের ঘর থেকে অন্য ছাত্রীরা সবাই এসে ঘরে ঢুকল।

‘কী হয়েছে আপু? কী হয়েছে?’

‘দেখ, দেখ। চুমকি বলছে আমি না কি চোর। বল সবার সামনে বল, আমি কী চুরি করেছি? কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে আমি চোর, তাহলে কুত্তা দিয়ে আমার মাংস নিজে খাওয়াব।’ উত্তেজিত হয়ে তুই-তোকারিতে নেমে এলো রিয়া।

‘দেখেন আপু, মুখের ভাষা ঠিক করেন। না হলে ভালো হবে না কিন্তু।’ চুমকিও শাসাল।

অন্য ছাত্রীরা কপটভাবে বলল, ‘আহা! আপু থামেন না।’

বেশ মজা পাচ্ছে ওরা।

‘থামব কেন! ওকে আমি চিনি না। লেখাপড়ার নাম করে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চাইনিজে, পার্কে, খালাতো ভাইয়ের সাথে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আমি জানি না ভেবেছ?’

অন্য ছাত্রীরা এটা শুনে বেশ মজা পেল। কেউ কেউ নতুন ইনফরমেশন পেয়ে শিহরিত হলো।

‘আর তুই! তুই কী করিস, মনে করেছিস কিচ্ছু জানি না! আমি না হয় নিজের খালাতো ভাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই, তুই যে চৌদ্দটা ছেলের সাথে প্রেম করে বেড়াস, আমরা কী তা জানি না।’

প্রচণ্ড রেগে গেল রিয়া। টেবিল থেকে চট করে তুলে নিল স্টিলের স্কেল। অবস্থা বেগতিক দেখে অন্য ছাত্রীরা জোর করে রিয়ার ঘর থেকে বের করে আনল চুমকিকে।

নিজের ঘরে ফিরেও ফোঁস ফোঁস করতে লাগল চুমকি।

‘মারবি আমাকে। মেরে দেখ, তোর হাত আমি যদি ভেঙে না ফেলি তো আমার নাম চুমকি না।’

মোবাইল বেজে উঠল। ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। গ্রামের বাড়ি থেকে আম্মু ফোন করেছে। প্রতিদিন রাতেই ফোন করে ওর খোঁজ নেয়। দু’বার কলটা ধরল না। তৃতীয়বার ধরার আগে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

‘হ্যালো আম্মু।’

‘কী রে মা! ফোন দিচ্ছি, ধরছিস না কেন?’

‘একটু ব্যস্ত ছিলাম আম্মু।’

‘কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলি মা?’

‘ওহেহা আম্মু। তোমার সবকিছুতে শুধু কৌতূহল আর কৌতূহল।’

‘এমনিই জানতে চাইছিলাম রে মা। ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত ছিলি নাকি?’

‘না আম্মু। তুমি যে কী বলো না। আমার ফিজিক্স বইটা খুঁজে পাচ্ছি না। সে বইটা খুঁজতে গিয়েছিলাম একটা আপুর ঘরে। ওই আপুটা না মহা বদমাশ। শুধু অন্য রুমমেটদের জিনিস চুরি করে। আমার ফিজিক্স বইটাও ঐ আপুটাই নিয়েছে।’

আম্মু হাসলেন।

‘আরে পাগলি, ঐ বই তো এখানে রেখে গিয়েছিস। সাথে করে নিয়ে এসেছিলি। তোর ফুপুর বাসায় সেদিন বেড়াতে গিয়ে ওখানে ফেলে এসেছিলি। তোর ফুপাতো ভাই রাজা আজ সন্ধ্যার পর বইটি আমাদের বাসায় দিয়ে গেছে। বই হারায়নি, চুরিও হয়নি, বুঝলি।’

কথা তো নয় যেন বোমা ফাটিয়ে বই চুরির রহস্য ফাঁস করলেন চুমকির আম্মু!