আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘রাজনীতিতে আজ শৌখিন পোস্টার, লিফলেট ও ব্যানার আছে; কিন্তু সৌজন্যবোধ বিরল প্রজাতির প্রাণীর মতো হারিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই খারাপ। রাজনীতির জন্য এটা নেতিবাচক দিক, যেটা আমরা এড়াতে পারছি না। রাজনীতিতে বিভাজন ও মেরুকরণ এত বেশি যে ভাবতেই কষ্ট লাগে। সাংঘর্ষিক ও বিভাজনের রাজনীতি এমন পর্যায়ে গেছে, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যেতেও এখন রাজনীতিকরা দ্বিধাবোধ করেন, কারো মৃত্যুর পর জানাজায় যাব কি না, তা নিয়েও দ্বিধায় পড়তে হয়। এসব বিষয় রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।’ গতকাল শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-আইডিইবিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় পার্টি-জেপির কেন্দ্রীয় ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘একটা অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল আজ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দিক থেকে এই দেওয়াল ভাঙার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পর একজন সন্তানহারা মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘরের ভেতর-বাইর থেকে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। যার কারণে অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল আরো উঁচু হয়। সেদিন যদি প্রধানমন্ত্রী সন্তানহারা বেগম জিয়াকে ঘরের ভেতরে গিয়ে সান্ত্বনা দিতে পারতেন, তাহলে রাজনীতিতে কর্মসম্পর্কের ইতিহাস নতুনভাবে সৃষ্টি হতে পারত।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ অনেক অশুভ চক্রান্ত আছে। রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্ত আছে। বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ, আছে রক্তের গন্ধ। সাম্প্রদায়িক ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।’ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির কমন শত্রু সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে জেপিসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, গণতন্ত্র এক চাকার বাইসাইকেল নয়। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র দুই চাকার সাইকেল। গণতন্ত্রের বিকাশে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলও অপরিহার্য শক্তি। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে বিরোধী দলকেও শক্তিশালী হতে হবে। কারণ শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র কল্পনা করা যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনীতিতে যে অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে, সেটির সৃষ্টি হয় ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা ছিল তাদের ভূমিকা বাদ দিয়ে তো ইতিহাস লেখার উপায় নেই। সেদিন কারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছিল, কারা তাদের বিদেশে দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল, কারা ইনডেমনিটি আইন করে খুনিদের বিচার বন্ধ করেছিল—সেসব ইতিহাস সবার জানা। রাজনীতিতে সম্পর্কের এই অলঙ্ঘনীয় দেওয়াল সেখান থেকেই উঁচু হতে শুরু হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এখন আরো উঁচু। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রাইম টার্গেট করে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। কারা তখন ক্ষমতায় ছিল, এর মাস্টারমাইন্ড কারা ছিল—সেটিও সবার জানা। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যকে অস্বীকারের উপায় নেই।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটের আগে বেগম জিয়াকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বেগম জিয়া গালাগালি করে ও ঘৃণাভরে সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। টেলিফোনে কী অশ্রাব্য ভাষায় সেদিন বেগম জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চ স্বরে কথা বলেছিলেন! তাহলে বিএনপির সঙ্গে কী করে আমাদের কর্মসম্পর্ক গড়ে উঠবে? কীভাবে বিএনপির সঙ্গে সহাবস্থান করব? তিনি বলেন, তারাই তো ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড ছিল, এটা বাস্তবতা। এত কিছুর পরেও এবারের নির্বাচনের আগেও প্রধানমন্ত্রী বিএনপি ও তাদের দোসরদের গণভবনে সংলাপে আমন্ত্রণ জানান।
তিনি বলেন, বিভাজনের রাজনীতি কেন প্রকট হচ্ছে এবং কারা সংকট সৃষ্টি করছে সেজন্যই ইতিহাসের এই সত্যগুলো তুলে ধরা উচিত। আজকের এই মঞ্চে কথাগুলো বলার শক্তি ও সাহস এজন্য পেয়েছি। কারণ এখানে আমরা সবাই সমমনস্ক। জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান এক, অভিন্ন। সেজন্য কথাগুলো এখানে উচ্চারণ করতে পারলাম। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদেরও চলার পথে কৌশলের ভুল আছে। ভুলত্রুটি মিলিয়েই বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে দেশটাকে আজ আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বে প্রবৃদ্ধিতে আজ বাংলাদেশ এক নম্বরে। এটা বিরাট সাফল্য। এটা ১৪ দলসহ আমাদের সবার সমন্বিত প্রয়াসের সোনালি ফসল।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে জাতীয় পার্টির সমর্থনের কথা তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, ’৯৬-এর নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ যখন কিছু আসনের সংকটে ছিল, একক মেজরিটি ছিল না—সেই গভীর সংকটে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠনে আওয়ামী লীগকে জাতীয় পার্টির সমর্থন করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখেন আজকের জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। সেই দুঃসময়ে তিনি শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ান। এই কৃতজ্ঞতা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। আমার এখনো মনে আছে—আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তখন বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হবেন, এজন্য যদি আমি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে উপনির্বাচনও করতে হয় তাহলেও আমি আওয়ামী লীগকেই সমর্থন দেব।’ এভাবেই শেখ হাসিনার প্রতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছিল। মঞ্জু ভাই সেদিন এই সহযোগিতার সঙ্গে গোটা জাতীয় পার্টি ও কারাবন্দি এরশাদকেও সম্পৃক্ত করেছিলেন। এজন্য আজও আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। পরেও, এখনো আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন এবং সেদিনের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দিনগুলোতেও তার ভূমিকা ছিল অনন্য।
জেপির কাউন্সিলে শুভেচ্ছা জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের উত্তাপ, মেধা ও শ্রমের মধ্য দিয়ে গড়া এবং ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও শামসুল হকের দল; সেই দলের পক্ষ থেকে এবং এখন যে দলের কাণ্ডারি ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনা তার পক্ষ থেকে জেপির কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। এসময় তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের এবং ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকেও স্মরণ করেন ও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
সিটি নির্বাচনে মাঝপথ থেকে পালিয়ে যাবেন না: বিএনপিকে মোহাম্মদ নাসিম
জেপির কাউন্সিলে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে রাখা বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সামনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, বিএনপিকে বলব—মাঝ পথ থেকে আপনারা পালিয়ে যাবেন না। মাথা সোজা রেখে নির্বাচন করুন। আপনারা ভয় পান কেন? শক্ত করে দাঁড়ান। বিরোধী দল শক্তিশালী হলে সরকারও শক্তিশালী হয়। আপনারা শক্তভাবে নির্বাচনে থাকলে আমরাও কাজ করতে পারব। বিএনপিকে অনুরোধ করে বলতে চাই- ভোটের মাঠে থাকুন, লড়াই করুন, অজুহাত তুলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না, শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকুন, জনগণের রায় মেনে নিন, আমরাও জনগণের রায় মেনে নেব।
তিনি বলেন, আমরা সরকারের অংশ হয়েও বলতে চাই, সিটি নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। এর কোনো বিকল্প হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। নির্বাচন কমিশনকে বলব, তাহলে আপনারা ভয় পান কেন। প্রশাসনকে বলব, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হবে। এখানে কোনো আপস হবে না। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চাই না।
১৪ দলের পক্ষে ঢাকা উত্তরে জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম এবং দক্ষিণে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়ে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আপনারা ঘরে ঘরে গিয়ে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইবেন। ভুলত্রুটি যা-ই থাক না কেন, আমরা ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে চাই, ডেঙ্গু-মশামুক্ত ঢাকা করতে চাই। আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে এত কাজ করে যাচ্ছি, কিন্তু দুঃখ হয় যখন শুনি পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত নগরী ঢাকা। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে জাতীয় পার্টির সমর্থনের ক্ষেত্রে নাসিমও জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেন।
এলাকার উন্নয়নে সরকার যা দেয়, তার তিন-চতুর্থাংশই পকেটে যায় : আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্বকারী, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে। শুধু হাত বদলের জন্য সংগ্রাম করিনি। সাড়ে সাত কোটি মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, পশ্চিম পাকিস্তান তাদেরকে ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ হওয়ার পর যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিলেন তারা খেয়াল করেন না যে, ‘৭২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর মাত্র তিন বছরের মতো তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়ে তিনি আমাদেরকে একটা সংবিধান দিয়ে গেছেন। দেশটা কীভাবে চলবে, সেকথা ভেবেই তিনি এই সংবিধান দিয়ে যান। যেমন করে একটি কোম্পানি চলতে হলেও একটা ছোট্ট বই লাগে। অনেকে বলেন- বঙ্গবন্ধুকে এভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হল, সিঁড়িতে তার মরদেহ পড়ে ছিল; তার পরেও বলব বঙ্গবন্ধু একটা সন্তুষ্টি নিয়ে মারা গেছেন, কোনো দুঃখ নিয়ে তিনি মারা যাননি। কারণ তিনি দেশটাকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীন করে গেলেও আমরা বলি—দেশটা ভালো চলছে না, পিরোজপুর-নাজিরপুরে কিছুই হয়নি। এসব তো ছোটোখাটো ব্যাপার। কেন হয়নি? যারা নেতা হয়েছেন, এলাকার উন্নয়নে সরকার থেকে যা যায় সেটির তিন চতুর্থাংশই তারা পকেটে ভরেন। নিজ নিজ এলাকাকে ভালোবাসতে হবে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কয়জন মালিক, কয়জন অন্যদের জন্য কিছু করার সুযোগ পান? সুতরাং যারা এই সুযোগ পেয়েছেন তারা মানুষের জন্য কিছু করে যান। এই সুযোগ তো অন্য কেউ নয়, দিয়েছেন আল্লাহ। আল্লাহর সাথে বেইমানি, মোনাফেকি করা যায় না। ধৈর্য ধারণ করুন। পিরোজপুর-নাজিরপুরে কিছু হয়নি, সব ভাণ্ডারিয়ায় নিয়ে গেছে, তাহলে এমপি সাহেবরা কি করেন? বাসস্ট্যান্ড ও জমি দখল করলে তো হবে না, এমনকি টেন্ডারও করতে দেওয়া হয়নি। আমরা ভাণ্ডারিয়ায় একটা বাসস্ট্যান্ড করার চিন্তা করছি। এই যে চিন্তা করছি, এই সাহস ও মনোবলই বাংলাদেশ। তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে ৩৬ বছর ধরে সংসদে আছি। সবসময় বলি—আপনারা এক থাকুন, রাজনীতি যার যেটা ইচ্ছা করুন, কিন্তু সরকার থেকে যত টাকা যায় সেটা দিয়ে যদি ঠিকঠাক মতো কাজ হতো তাহলে অনেক কাজই হতো। আমি অনেকবার দেখেছি ১০ টাকার প্রকল্প ১০ হাজার টাকায় হচ্ছে। আমি ভাণ্ডারিয়ায় গিয়ে চিল্লাই—রাস্তায় ছয় নম্বর ইট কেন দেওয়া হলো। কিন্তু যখন দেখি ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ৫০ হাজার টাকায় হচ্ছে, তখন ভাবি এইতো পিঁপড়া গুড় খাচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সেই জন্মলগ্ন থেকেই শুনে আসছি- সব দোষ রাজনীতিকদের; তারা সবাই চোর; তারা সবাই চাল, গম খেয়ে ফেলেন; রাস্তায় ছয় নম্বর ইট দেন। ১৮ বছর সরকারে থেকে দেখেছি আমাদের অর্থাত্ রাজনীতিকদের ছেলেপেলেরা যা খায় তারচেয়ে বেশি গুড় খেয়ে ফেলে পিপড়া। গত দুই বছর ধরে যা দেখছি, সরকার যে টাকা দেয় সেটা যে শুধু ঠিকাদাররাই খান তা নয়। এটা সবাই বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। বিশেষত, সরকার প্রধান চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই খাওয়া বন্ধ করা যায়নি। এখন একটা গবেষণা দরকার যে—সেই ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমল থেকে ৫০০ বছরেও কেন এই খাওয়া বন্ধ করা গেল না, নিশ্চয়ই এর কারণ আছে। এটাও সত্য, আল্লাহ হাতের পাঁচ আঙ্গুলও সমান করেননি।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, যারা নিজেদের বড়ো দল দাবি করেন তারা যে অর্থ খরচ করেন সেটির ১ হাজার ভাগের এক ভাগ খরচ করলেও কিংবা করতে পারলেও আজ ঢাকা শহর অচল হয়ে যেত। কিন্তু জেপির রাজনীতি যারা করেন তারা গুড় খান না, তারা চান দেশটা ভালো চলুক। তিনি বলেন, ভূমিদস্যু যতবড়ো লোক ততবড়ো চোর; আমার বন্ধুবান্ধবের মধ্যেও অনেকে বড়ো লোক, তারা ডাকলে যাই, কিন্তু সম্মান করি না। ব্যাংক লুট করেছে কারা? সবাই শুধু বলে লুট হয়েছে। সরকারের এতবড়ো মেশিনারিজ, তার পরেও ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটেরারা ধরা পড়ে না কেন? স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ব, গরীব-দুঃখী মানুষ থাকবে না- এরকম চিন্তা করা ভালো। কিন্তু বাস্তব কাজটা সহজ নয়। এটা একটা দীর্ঘ পথ। আমরা কঠিন তবে সরল পথে আছি। মাথা উঁচু করে কথা বলি। বামপন্থিদের মতো বলতে পারব না, আমি সমাজ পরিবর্তনের লোক নই। শুধু এটা বুঝি সমাজে সুযোগটা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কাজেই জেপি যেটা চায় সেটা সোজা পথ। অবশ্যই আমাদের জয় হবে। মোমিন হলে জয় সুনিশ্চিত। আমরা মোমিন কি না জানি না, তবে বিপথগামী হইনি।
রাজনীতির মাঠকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ করতে হলে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ধ্বংস করতে হবে: ইনু
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথির বক্তব্যে ১৪ দল শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, রাজনীতির মাঠকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ করতে হলে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ধ্বংস করে দিতে হবে। ভবিষ্যতে জাতিকে আরেক ধাপ ওপরে টেনে তুলতে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। ১০ বছর ১৪ দলের ঐক্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ধ্বংস হওয়া থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি, এখন এটিকে বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে ঐক্যটা ধরে রাখা দরকার। তিনি বলেন, ‘৭৫ এর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জাতীয় জীবনে, দেশ ও জাতিতে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। দেশ, জাতি ও রাজনীতিতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। ১৫ আগস্টের হত্যার মধ্য দিয়ে সামরিক শাসকরা জবরদস্তির রাজনীতি চাপিয়ে দেয়। আঁস্তাকুড়ে থেকে জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের সঙ্গে বেইমানি করে। ইনু বলেন, জাতির ভবিষ্যতের জন্য উল্লম্ফন দরকার। উল্লম্ফন যদি করতে চান, বাংলাদেশকে যদি রক্ষা করতে চান তাহলে এই ঐক্যকে ধরে রাখতে হবে।
‘৭১ এর পরাজিত শক্তি গণতন্ত্রকে বিপর্যয়ে ঠেলে দিতে চায়: দিলীপ বড়ুয়া
আমন্ত্রিত অতিথির বক্তব্যে ১৪ দল শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ’৭১ এর পরাজিত শক্তি বিএনপির ঘাড়ে ভর করে গণতন্ত্রকে বিপর্যয়ে ঠেলে দিতে চায়। রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করতে বিশেষ চক্র উঠেপড়ে লেগেছে। বাংলাদেশের যে ঈর্ষণীয় উন্নয়ন তা অনেকে মানতে পারছে না। তাই আত্মতৃপ্তিতে না ভুগে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।
দুর্নীতিবাজদের জন্য বাংলাদেশের মাটি হারাম করে দিতে হবে: শেখ শহীদ
জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, এক শ্রেণির মানুষ অর্থনীতির সুফল ছিনিয়ে নিতে চায়। সমাজে আমরা দেখছি সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও বৈষম্য। দুর্নীতিবাজদের জন্য বাংলাদেশের মাটি হারাম করে দিতে জেপি প্রস্তুত রয়েছে। দুর্নীতিবাজ যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। যে কোনো কারণেই হোক, মাঝেমধ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করতে দেখি। আপস নয়, এই অপশক্তিকে নির্মূল করতে হবে।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততে ঐক্যের বিকল্প নেই: নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী
অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে ১৪ দলের আরেক শরিক বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততে ঐক্যের বিকল্প নেই। আমরা সবাই ভালো থাকলেই কেবল বাংলাদেশ ভালো থাকবে। স্বাগত বক্তব্যে জেপির নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে জেপি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জেপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিঃশর্ত সমর্থন জানায়। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহিম, এজাজ আহমেদ মুক্তা, মফিজুল হক বেবু, রুহুল আমিন, আবু সাঈদ খান ও নাজমুন নাহার বেবী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক সালাহউদ্দিন, সহ সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, আমিনুল ইসলাম তপন ও মজিবুর রহমান মজনু, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু এবং জাতীয় যুবসংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধন ও শোক প্রস্তাব
কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে আলোচনা শুরুর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জাতীয় এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম দলীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কাউন্সিল উদ্বোধন করেন। এসময় তারা বেলুনও ওড়ান। এরপর জাতীয় সংগীত ও কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে উদ্বোধনী পর্ব শুরু হয়। অতিথিদের বক্তব্যের আগে দলের বিগত কাউন্সিলের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী দলের নেতৃবৃন্দ ও জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন শেখ শহীদুল ইসলাম। যাদের জন্য শোক প্রস্তাব আনা হয় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—এইচ এম এরশাদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, আমেনা বারী, সাদেক হোসেন খোকা, ড. টি আই এম ফজলে রাব্বি চৌধুরী, মইন উদ্দীন খান বাদল, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, তরিকুল ইসলাম, স্যার ফজলে হাসান আবেদ, সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, আবরার ফাহাদ, নুসরাত, অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ, কালীদাস কর্মকার, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সুবীর নন্দী ও মাহফুজুর রহমান প্রমুখ। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থিত সবাই এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। পরে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
নেতা-কর্মীদের ভিড়
সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারা সুসংহতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা কায়েমের প্রত্যয় নিয়ে জেপির এবারের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশ থেকে ৩ হাজার কাউন্সিলর ছাড়াও আরো প্রায় ৩ হাজার প্রতিনিধি অংশ নেন কাউন্সিলে। কাউন্সিল উপলক্ষ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে পোস্টার সাঁটানো হয়। এছাড়াও দলের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলামের ছবি এবং দলের লোগো ও নির্বাচনী প্রতীক ‘বাইসাইকেল’ সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন শোভা পায় কাউন্সিলস্থলসহ নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহ, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া-কাউখালী-ইন্দুরকানিসহ বরিশাল বিভাগ ছাড়াও সারাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কাউন্সিলে আসেন। নেতাকর্মীদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। হলের ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় নেতাকর্মীদের অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন।