পৌষের রোদ মাখা দিনে শুরু পৌষমেলা

ফিরে চল্, ফিরে চল্, ফিরে চল্ মাটির টানে —/ যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।/ যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে, হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,/ ডাক দিল যে গানে গানে

শিল্পীদের গানে এই আমন্ত্রণী ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানীর পৌষমেলার অঙ্গনে। বাংলা একাডেমির শিশির ভেজা ঘাস মাড়িয়ে ভোরবেলা উপস্থিত অসংখ্য মানুষ। ভরা পৌষে বৃষ্টির সঙ্গে নামছে হাড়কাঁপানো শীত, সেই সঙ্গে শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এই বৈরী বৃষ্টিস্নাত শীতের দিন পেরিয়ে রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়ায় রাজধানীতে শুরু হয়েছে পৌষমেলা।

পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়/ ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে, মরি হায় হায় হায়/— শিল্পীদের এই আমন্ত্রণে যারা এসেছিলেন তারা মেতে উঠেছিলেন পিঠা-পুলি খাওয়ায়। জমে উঠেছিল পৌষমেলা। শিল্পীদের গানে, কবিতার উচ্চারণে, পিঠা-পুলির মন মাতাল করা ঘ্রাণ মনে করিয়ে দিয়েছিল গ্রামের সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা। নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও বাঙালির মন থেকে হারিয়ে যায়নি গ্রামীণ জীবনের স্মৃতিমাখা উত্সবগুলো। তাই, গতকাল শুক্রবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত পৌষমেলা নাগরিক জীবনে অনাবিল প্রশান্তির স্পর্শ বুলিয়ে দিল। স্টেজে গান শুনে নাচ দেখে আর মেলার স্টলগুলোতে দল বেঁধে পিঠা, খেজুরের রসে সিক্ত হয়ে নগরবাসী উদ্যাপন করছে তিন দিনের এই পৌষমেলা।

নতুন প্রজন্মকে বাঙালির বিলুপ্তপ্রায় শীতকালীন পিঠাপুলির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই মেলার আয়োজন। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার সকাল থেকে বাংলা একাডেমির মাঠে শুরু হয়েছে তিন দিনের পৌষমেলা। এই মেলার আয়োজন করেছে  পৌষমেলা উদ্যাপন পরিষদ।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘প্রার্থী’ কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে ‘আইল্লা’ জ্বালিয়ে মেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। তিনি বলেন, নগরে বেড়ে ওঠা শিশুরা বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে। এই পৌষমেলা শেকড়ের সঙ্গে তাদের কিছুটা হলেও পরিচয় করিয়ে দেবে।

পৌষমেলা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর ধরে আমরা এই মেলার আয়োজন করে চলেছি, যা শহুরে জীবনে গ্রামীণ সংস্কৃতিকে তুলে ধরে, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটায় চিরায়ত বাংলার।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পৌষমেলা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ফকির আলমগীর, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ ও পৌষমেলা উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন পৌষমেলা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিত্ রায়। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন পরিষদের অনুষ্ঠান সমন্বয়ক মানজার চৌধুরী সুইট।

এরপর বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। মেলায় মোট ৫০টি স্টল সাজানো হয়েছে বিভিন্ন জেলার শীতকালীন ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলির পসরা নিয়ে। ২০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের বাহারি সব পিঠা পাওয়া যাচ্ছে এখানে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রথম দিন সকাল থেকেই ছিল গান নাচ পরিবেশনা। সেই সঙ্গে সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হয় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে আসা গীতিনৃত্য লখিন্দরের পালা। আজ রবিবার দ্বিতীয় দিনেও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি থাকছে টাঙ্গাইলের সংযাত্রার পালা এবং শেষ দিন মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা।

সোমবার পর্যন্ত একাডেমি প্রাঙ্গণে পৌষমেলা চলবে সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। প্রতিদিনই থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা শুরু হবে প্রতিদিন বিকাল সাড়ে ৩টায়।