ব্যতিক্রমী গায়ে হলুদ!

জুনায়েদ হাবীব, চট্টগ্রাম থেকে

 

চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ততম এলাকা নাসিরাবাদের প্রতিদিনের চিত্রটা এক। গার্মেন্টস কারখানার চারপাশ সেলাই মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ, শ্রমিকের পদচারণায় মুখর পুরো এলাকা। সকাল থেকে গভীর রাত, এমনকি সারারাত দূর থেকে শোনা যেত মেশিনের শব্দ। এসব কোলাহল শুনে বোঝাই যায় হাত-পায়ে সমানতালে কাজ করতেন শ্রমিকরা। কিন্তু গত ৩ জানুয়ারি হটাত্ পাল্টে গেল পুরো পরিবেশ। সব সেলাই মেশিন বন্ধ!

দুপুর ১১টা। ইন্ডিপেনডেন্ট গার্মেন্টসের প্রধান ফটকে পা রাখতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! একই রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে উত্সবমুখর শ্রমিকরা। কাজের দৌড়ঝাঁপ ছিল না একদম। বরং বাংলা-হিন্দি বিভিন্ন গানের তালে উত্সবমুখর পরিবেশে তারা। খানিকটা এগিয়ে জানা গেল এখানে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান চলছে। তবে যার হলুদ সন্ধ্যা আর যারা আমন্ত্রিত তাদের সম্পর্কটা ঠিক আত্মীয়তার নয়, বরং মালিক-শ্রমিকের।

যে গার্মেন্টসে ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছিল সেটার চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব। তার এক মাত্র কন্যা সাইকা তাফাননুম প্রীতির গায়ে হলুদের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানটি করা হয়েছিল নিজ গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের নিয়ে। বলা চলে চট্টগ্রামে এমন এক অনন্য আয়োজনের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। যা সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছে।

গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি ছাড়াই, শুধুমাত্র গার্মেন্টস কারখানার প্রায় দেড় হাজার শ্রমিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। নারী শ্রমিকদের জন্য হলুদ রঙয়ের শাড়ি ও পুরুষ শ্রমিকদের জন্য একই রঙয়ের পাঞ্জাবি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন তাদের মালিক। শুধু তাই নয়, যে শাড়িটি তিনি গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকদের জন্য কিনেছেন সেই একইরকম ডিজাইনের শাড়িটি নিজের স্ত্রী উলফাতুন্নেছা পুতুল ও স্বজনদের জন্য কিনেছেন। তেমনই গার্মেন্টসের পুরুষ প্রমিকদের জন্য যে পাঞ্জাবিটি কিনেছেন সেটিও নিজের জন্য কেনেন চট্টগ্রামের এ শিল্পপতি।

শুধু পোশাকে নয়, অনুষ্ঠানের খাবারেও ছিল আভিজাত্য। মোরগ, ডিমকারি, কোপ্তা, বোরহানি, জর্দাসহ বাদ যায়নি কিছুই। সেসবের রান্না করেছেন চিটাগাং ক্লাবের প্রধান রাঁধুনি। দেখা যায়, এই দম্পতির একমাত্র কন্যা সাইকা তাফাননুম প্রীতির গায়ে হলুদ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চারদিকে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল উচ্ছ্বাস। গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকদের কণ্ঠে ‘হলুদ বাটো, মেন্দি বাটো’, ‘লীলাবালি লীলাবালি...সাজাইবো তোরে..!’ গানের তালে তালে সুন্দর করে নাচছিলেন সবাই। সঙ্গে পুরুষ শ্রমিকদের আধুনিক নাচের পরিবেশনা আয়োজনটিতে যোগ করেছিল অন্যমাত্রা।

শ্রমিক জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘প্রীতি আপা মাঝেমধ্যেই স্যারের সঙ্গে আমাদের দেখতে আসেন। আর তিনিও স্যারের মতো আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কথা বলেন। তবে গায়ে হলুদে আমাদের নিয়ে এতে সুন্দর আয়োজন করা হবে সেটা কখনো কল্পনা করতে পারিনি।’ এমন আয়োজনের ব্যাপারে বলতে গিয়ে গার্মেন্টসটির

এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘আমার গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করার অনেকদিনের একটি ইচ্ছে ছিল। আমি যেমন শ্রমিকদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করি তেমনি শ্রমিকরাও আমার রুটি রুজির ব্যবস্থা করে। তারা ছাড়া আমার মেশিনগুলো চলবে কী করে! আমি মনে করি শ্রমিকরা আমার পরিবারের একটি অংশ। আর শ্রমিকরাও আমার মেয়েকে খুব পছন্দ করেন, যে কারণে প্রীতির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটিকে তাদের জন্য বেছে নিয়েছিলাম। সবচেয়ে বড় কথা, তারা আমাকে না জানিয়েই নিজেরা চাঁদা তুলে দেড় লক্ষ টাকায় গহনা কিনে উপহার দিয়েছে।’