ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার মাশুল গুনছে ইইউ

এম এ আলআমিন

 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী  বরিস জনসন ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার জন্য চলতি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সময় পেয়েছেন। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে ব্রিটেনবাসী ভোট দেওয়ার পর থেকেই দেশটি অস্থির সময় পার করছে। এ সময়ের মধ্যে তিন জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে ব্রিটেন। বিশেষ করে দুজন এসেছেন শুধুই ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার হাত ধরে।

কেবল ব্রিটেন নয়, গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে ব্রাসেলসকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে এই একটি ইস্যু নিয়ে। ২৮ জাতি জোট ইইউর সদর দফতর অন্যান্য ইস্যুর দিকে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ পায়নি। কূটনৈতিক দিক থেকে এটি ইইউর জন্য এক বড়ো ক্ষতি। ব্রেক্সিট হলে ইইউকে যতটুকু মূল্য দিতে হতো এই প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তার চেয়ে বেশি মাশুল গুনতে হয়েছে। ইইউভুক্ত দেশগুলো মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মূল্যবোধগুলোর ক্ষেত্রে যে উচ্চমান লালন করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবনমন ঘটলেও সেগুলো দেখার কেউ ছিল না। উদাহরণ স্বরূপ পোল্যান্ডের কথা বলা যায়। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি ক্ষমতাসীন ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে তারা যে আইন সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সুপ্রিম কোর্ট এত কড়া ভাষায় ক্ষমতাসীন দলকে সতর্ক করেছে যা থেকে ধারণা হতে পারে দেশটি ইইউ থেকে সম্ভবত বেরিয়ে গেছে। প্রস্তাবিত সংস্কারে বলা হয়েছে বিচারকরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সরকার তাদের শাস্তি দিতে পারবে। বিষয়টি ইইউ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইইউ নীতিমালায় বলা হয়েছে আদালত সরকারের হস্তক্ষেপের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। তবে এ ঘটনা এই অর্থ বহন করে না যে পোল্যান্ড ইইউ থেকে বেরিয়ে যেতে চায়।

ইইউর আইন অনুযায়ী কোনো সদস্য দেশকে জোট থেকে বহিষ্কার করা যায় না। অনুচ্ছেদ ৭ অনুসারে সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা বা সদস্য হিসেবে যেসব সুযোগ পাওয়ার কথা সেগুলো স্থগিত রাখা যেতে পারে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইউরোপীয় আইনের অধ্যাপক রোনান ম্যাকরিয়া বলেন, ‘এ পর্যন্ত বেশ কিছু দেশ ইইউ বিধি ভঙ্গ করেছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে জোটগতভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের কথা বলেন। ওরবান একাধিকবার আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম বিষয়ক ইইউর বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন। মাল্টার কথাও এ প্রসঙ্গে আসে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাসকাটের সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডাফনে গালিজিয়ার সম্ভাব্য হত্যাকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। গালিজিয়া সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করছিলেন।  ক্রোয়েশিয়ার সরকারের বিরুদ্ধেও বিদ্যমান আইন সংশোধন করে গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের পথ উন্মুুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।

সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্মের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আগাতা গোস্তিরিস্কা জাকোবস্কা বলছেন, ইইউর কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার বিষয়টি জড়িত। একক বাজার বা মুদ্র ব্যবস্থার মতো জোটের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আস্থার ভিত্তিতে নড়বড়ে হয়ে গেলে পুরো জোটকে পস্তাতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ সমস্যাগুলো ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের পক্ষে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা ধরে নেওয়া হচ্ছে যে প্রত্যেকটি দেশের যার যার বিচারব্যবস্থা ইইউর আইনের প্রতি সম্মান দেখাবে। ম্যাকরিয়া বলছেন, সদস্য দেশগুলো ইইউর আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকছে কি না সেটা নজরদারি করা ব্রাসেলসের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ইইউর নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো এত বিশাল নয় যা দিয়ে পুরো মহাদেশের নজরদারি করা সম্ভব। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকেই ইইউ সদস্য দেশগুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে পারেনি। নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের রাজনৈতিক কনসালটেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতবা রহমান অবশ্য মনে করেন, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে দর কষাকষি করার সময় ইইউ দেশগুলো পরস্পরের আরো কাছাকাছি আশার সুযোগ পেয়েছে। চলতি বছর প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর পারস্পরিক যোগাযোগ ধরে রাখতে পারে কি না সেটি এখন দেখার বিষয়।