কবিতা

‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যুগান্তকারী কবিতা—যতটা কাব্যগুণে নয়, তার চেয়ে বেশি ঐতিহাসিক অর্থে। এই কবিতাই নজরুলকে প্রথম বাংলা কাব্য-জগতে প্রতিষ্ঠিত করে, এতেই তাঁর প্রথম প্রবল স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা। কিছু পরিমাণে স্বাতন্ত্র্য ও শক্তির পরিচয় তিনি অবশ্য এর আগেও দিয়েছিলেন, যেমন ‘শাতিল আরব’ কবিতায়, কিন্তু তাঁর বিশিষ্ট প্রতিভার চোখ-ঝলসানো দীপ্তি ‘বিদ্রোহী’তেই প্রথম প্রকাশ পায়, এটিই তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় কবিতা। রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত হওয়ার জন্য সংশয়কুল সে সময়কার কিছু সংখ্যক তরুণ কবি যে সংশয়কুল স্বপ্ন দেখছিলেন, বিদ্রোহী কবিতায় তার প্রথম নিঃসংশয় সবল রূপায়ণ দেখা গেল, নতুন কবিতা রচনার সম্ভাবনা বাস্তব সত্য হয়ে উঠল। এই কথাটাই বুদ্ধদেব বসু এক জায়গায় বলেছেন।

কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হ’তো—যেন রাজদ্রোহের শামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রাভরা নেশা, তার বেলোয়ারি আওয়াজের জাদু—তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার: আর অন্য কিছু চাইল না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারল না—যতদিন না ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙল।

                          রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক: সাহিত্যচর্চা

‘বিদ্রোহী’ কবিতার ঐতিহাসিক তাত্পর্য সম্পর্কে সকলেই প্রায় একমত, কিন্তু কাব্যমূল্য সম্পর্কে নন। কেউ কেউ এ কবিতাকে নজরুলের শ্রেষ্ঠতম কবিতাগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি নন, অন্তত বুদ্ধদেব বসু তাঁর সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’য় একে স্থান দেননি এর ঐতিহাসিক তাত্পর্য সত্ত্বেও। বহু সমালোচক এ কবিতা প্রকাশের সময় থেকেই এর ত্রুটিগুলির প্রতি অঙ্গুলি-নির্দেশ করে আসছেন। তাঁদের মোটামুটি বক্তব্য এই যে, এ কবিতা হতবুদ্ধিকর অর্থহীন অসংযত দুঃসাহসিক ভাবোচ্ছ্বাস মাত্র, এর আগাগোড়া একই সুরে বাঁধা নয়। এতে পরস্পরবিরোধী রসের বিচিত্র সংমিশ্রণ ঘটেছে এবং তার ফলে কাব্যানুভূতির ঐক্য ব্যাহত হয়েছে। যেমন, এ কবিতায় একদিকে আছে:

আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,

আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!

আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী

আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

তেমনি অন্যত্র আছে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাব, বিপরীত রস:

আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখণ,

আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির কন-কন।

‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে কেউ কেউ আবার নিখুঁত কবিতা বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন। ড. কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর ‘নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা’ শীর্ষক আলোচনায় এ কবিতার প্রত্যেকটি পর্যায়ের বিশ্লেষণ করে নজরুলের কাব্যচিন্তার ক্রমিক প্রকাশের একটা অবিচ্ছিন্ন সূত্র নির্ণয় করতে চেয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে নজরুল তাঁর সূক্ষ্মচিন্তা ও উপলব্ধিকে ‘বিদ্রোহী’তে কাব্যরূপ দিয়েছেন সুশৃঙ্খলভাবে।

এই তিন রকম মতামতের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয়টিতে বেশ কিছুটা অতিরঞ্জন আছে বলে মনে হয়। ‘বিদ্রোহী’ নজরুলের স্মরণীয় কবিতাগুলির মধ্যে স্থান পেতে পারে না এরূপ মত গ্রহণ করা যায় না এই কারণে যে, নজরুলের যতগুলি বৈশিষ্ট্য সমস্তই লক্ষ করা যায় এ কবিতায়। তাঁর বিদ্রোহন্মুখতা তাঁর অশান্ত্ত বেপরোয়া প্রকতি, তাঁর অনিশ্চিত কাব্যানুভূতি, তাঁর বিদ্রোহী প্রকৃতি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা, কোমলচিত্ততা, তাঁর শক্তি ও দুর্বলতা, ছন্দ ও ভাষার উপর অসংশয় অধিকার, তাঁর বিশিষ্ট প্রকাশভঙ্গি সবকিছুরই নির্ভুল সরল লক্ষণ আছে এ কবিতায়। পরবর্তী জীবনে তিনি যতরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তার পূর্বাভাস এ কবিতার মধ্যে পাওয়া যায়। ‘বিদ্রোহী’ নজরুলের প্রতিভা ও যাবতীয় বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত কবিতা। এ কবিতাকে বাদ দিয়ে নজরুলের কোনো পরিচয় নেই, রবীন্দ্রোত্তর কাব্যেরও কোনো ইতিহাস নেই।     (প্রথমাংশ)

সূত্র: নজরুলের বিদ্রোহী (নজরুল ইন্সটিটিউট, ২০১৩)