সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংঘটিত অন্যতম বৃহত্ আন্দোলন হইল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। এই আন্দোলনের পরে অনেকেই আশা করিয়াছিলেন যে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিবে, ক্রমেই দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যাও কমিয়া আসিবে। কিন্তু সেই আশা সুদূর পরাহতই থাকিয়া গিয়াছে। সম্প্রতি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ২০১৯ সালে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরা হইয়াছে। সেইখানে দেখা গিয়াছে, পূর্ববর্তী দুই বত্সরের তুলনায় ২০১৯ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। নিসচার তথ্যানুসারে, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে ৫ হাজার ২২৭ জন নিহত হইয়াছে। ইহার আগের বত্সর ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৩৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছিল। ২০১৮ সালের তুলনায় ১ হাজার ৫৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটিয়াছে ২০১৯ সালে। গণমাধ্যমে প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ ও সংগঠনের বিভিন্ন শাখা সূত্রে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করিয়া এই প্রতিবেদন দিয়াছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নামের সংগঠনটি। আমরা আশঙ্কা করি, প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা তাহাদের উপস্থাপিত এই সংখ্যার তুলনায় বেশিই হইবে।
সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে নানাবিধ কারণ বিদ্যমান। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ঘটে ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকও ইহার জন্য দায়ী। সরকারি হিসাব মতে, দেশে ৩২ লক্ষ গাড়ির সরকারি নিবন্ধন রহিয়াছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে ২৫ লক্ষের। অর্থাত্ বাকি যানবাহন তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে। ইহা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ হইল ত্রুটিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা। মহাসড়কগুলিতে বাঁক থাকার কারণে সামনের দিক হইতে আসা গাড়ি দেখিতে না পাইয়া অনেক চালক দুর্ঘটনা ঘটাইয়া থাকেন। পাশাপাশি দেশে সড়ক-মহাসড়কের প্রশস্ততা ও যথাযথ রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যেমন অভাব রহিয়াছে; তেমনি ট্রাফিক আইন মানিয়া চলা ও ঝুঁকিহীন রাস্তা ব্যবহারে সচেতনতার অভাবও প্রকট। আরেকটি কারণ হইল বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কে চলাচলকারী তিন চাকার যানবাহন। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে হালকা তিন চাকার নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ। কিন্তু আরো ৩৪ লক্ষ এজাতীয় যানবাহন চলিতেছে নিবন্ধন ছাড়াই। এই বিপুলসংখ্যক নিবন্ধনহীন যান কীভাবে সড়কে নামে, তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।
সড়কে দুর্ঘটনা কমাইয়া আনিতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যাহারা অঙ্গীকার করিয়াছে যে ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামাইয়া আনিতে কাজ করিবে, বাংলাদেশ তাহাদের একটি। ফলে সরকারকে আন্তরিক হইয়া কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। আমরা দেখিয়াছি, সড়ককে নিরাপদ করিবার যে কোনো উদ্যোগ একটি বিশেষ শ্রেণির কারণে বারবার থামিয়া যায়। এই ক্ষেত্রে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে সরকারকে শক্ত হাতে যাহা করিবার তাহাই করিতে হইবে।