ড. এ কে আব্দুল মোমেন
টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে টেকসই শহর ও জনপদ গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্বব্যাপী অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাতসহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলার জন্য বৈশ্বিক ‘উন্নয়ন এজেন্ডা-২০৩০’ বা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে গৃহীত হয়েছে অভীষ্ট ১১। অভীষ্ট ১১ অনুযায়ী টেকসই শহর ও জনপদ গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সবার জন্য নিরাপদ ও মূল্যসাশ্রয়ী গৃহায়ণ, মৌলিক সেবায় পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা এবং বস্তিগুলো উচ্চতর স্তরে উন্নীত করা। বিশেষ করে নাজুক জনগণের প্রতি দৃষ্টি রেখে এই অভীষ্ট আরো কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া যেমন—নিরাপদ, সামর্থ্যের ভেতরে এবং সহজলভ্য পরিবহন পদ্ধতির সংস্থান। বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষাও লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে এখানে। বৈশ্বিক উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শহর ও জনপদ গড়ে তুলতে কাজ করছে।
২০১৫ সালে প্রায় ৪ বিলিয়ন মানুষ, অর্থাত্ মোট বিশ্ব জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ শহরে বাস করত। এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছেই। বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নগরায়ণের ক্ষেত্রে প্রভূত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই দ্রুত নগরায়ণ ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শহুরে বস্তির বৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত শহুরে সেবা এবং অবকাঠামো ও বায়ুদূষণ। শহরগুলোকে নিরাপদ করতে হলে শহরের পরিবেশগত প্রতিকূল প্রভাব ও দুর্যোগের কারণে মৃতের সংখ্যা যথাসম্ভব দ্রুত কমাতে হবে। একমাত্র নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিশেষত মহিলা, শিশু, বয়স্ক ও দৈহিকভাবে সীমাবদ্ধ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সহজে সুযোগপ্রাপ্ত সবুজ ও গণজায়গা বৃদ্ধি করা দরকার।
নগরায়ণকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটা অবশ্যম্ভাবী পরণতি বলে ধরে নেওয়া হয়। একটা আদর্শিক স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর পরিবেশ বলতে বোঝায় বিভিন্ন রকম সেবার সুযোগে স্বস্তিদায়ক প্রবেশগম্যতা। একটি আদর্শ নগরীর জন্য বেশ কিছু বিষয় প্রাধান্য পায়। যেমন—ক. পরিবহন—বাস, ট্রেন অথবা ট্রাম স্টেশনের দূরত্ব ৫০০ মিটারের কম, যেখানে হুইল চেয়ার যেতে পারে এমন প্রশস্ত পাকা ফুটপাত রয়েছে এবং কমপক্ষে প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর নিয়মিত সেবা পাওয়া যায়। খ. খাদ্য ও পণ্য—দোকানের দূরত্ব ৫০০ মিটারের কম। গ. সবুজ জায়গা—পার্কের দূরত্ব ৫০০ মিটারের কম। ঘ. প্রবেশগম্যতা বা সুযোগ—কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের নিমিত্তে নিরাপদ হাঁটা এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়ার জন্য সাইকেলের পথ—সব মিলিয়ে গণপরিবহনে আধা ঘণ্টার কম। ঙ. আবাসন—পরিবেশনীতি অনুসরণের জন্য, বসতবাড়ি নির্মাণে আবাসনের দাম ও রকমের মিশ্রণ, ভেতরে ও বাইরে বায়ুর গুণগত মান বিবেচনায় নেওয়া।
বাংলাদেশে নগরায়ণের মাত্রা (মোট জনসংখ্যার তুলনায় শহরের জনসংখ্যা) অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে। এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১৬ সালে জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ শহরে বাস করত। শহরে বসবাসরত জনসংখ্যার সংখ্যাগত হিসাবে এটা বেশ বড়ো অঙ্ক এবং অবিমিশ্র অর্থে এই সংখ্যা ৫৬ দশমিক ২৮ মিলিয়ন, যা দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। অন্যদিকে ভৌগোলিক দিক থেকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের নগরায়ণ স্তরে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান যেমন—সাতক্ষীরা জেলায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ঢাকা জেলায় ৯০ শতাংশের ওপরে। বাংলাদেশে মোট ৫৭০টি শহরকেন্দ্র রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা একটা মেগা শহর এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট হলো মেট্রোপলিটন এরিয়া। এর মধ্যে ২৫টি শহরের জনসংখ্যা ১ লাখের ওপরে আর বাকিগুলো ছোটো শহর।
বাংলাদেশে প্রধান ও অপ্রধান সব শহরের মূল সমস্যা পর্যাপ্ত আবাসনের অভাব। শহরে আবাসনের ঘাটতি ২০০১ সালের ১ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ইউনিট থেকে ২০১০ সালে ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউনিটে পৌঁছেছে। ঐ সময়কালে শহুরে জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ বাস করত ক্ষণস্থায়ী গৃহে এবং ২৯ শতাংশ বাস করত আধা স্থায়ী গৃহে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, শহুরে লোকজনের একটা বিরাট অংশ এমন সব বাড়িতে বাস করে, যার গুণগত মান খুব নিচের দিকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবাসনের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫৭ শতাংশ শহুরে জনগণ ইট ও সিমেন্ট মিশ্রিত দেওয়ালের বাড়িতে বাস করে।
শহরের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গড়পড়তা আয় বৃদ্ধির ফলে পরিবহনসেবার চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বভাবতই এই চাহিদা মেটানোর জন্য নানা ধরনের যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক পরিবহন শহরের রাস্তায় দেখা যায়। এর ফলে শহরের পরিবহন জগতে তীব্র যানজট একটা বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এবং এই সমস্যা রাজধানী শহর ঢাকায় বেশ প্রকট হলেও অন্যান্য শহর ও শহরকেন্দ্রে তীব্র যানজট দৃষ্টির বাইরে থাকে না। রাজধানী ঢাকাসহ সব শহরে যানজট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিভিন্ন ফ্লাইওভার নির্মাণ, মেট্রোরেল স্থাপন, রেপিড ট্রানজিট ইত্যাদি বর্তমান সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
সময়ের বিবর্তনে শহরাঞ্চলে নলের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির (পাইপড ওয়াটার) জোগান বেড়েছে। মেগাসিটি ঢাকাতে ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড সুয়ারেজ অথরিটি তার সেবা এলাকায় ৯০ শতাংশ প্রয়োজন মেটায়। জেলা শহরগুলোতে এই সুযোগ পায় ১৯ শতাংশ মানুষ। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। ১৯৮১ সালে ৩২.৪ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করলেও ২০১৭ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬.৮ শতাংশ। নিরাপদ শহরের জন্য সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান ঢাকা শহরের মোট নির্গত বর্জ্যের ৬০-৭০ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করছে সিটি করপোরেশন। সিলেট এবং চট্টগ্রামে যথাক্রমে ৭৬ ও ৭০ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করছে তারা। রাজশাহী, খুলনা এবং বরিশালসহ সব শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে জোর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয় যেমন—নদীভাঙন, সাইক্লোন, খরা, টর্নেডো, শৈত্যপ্রবাহ, বন্যা, হঠাত্ বন্যা-প্লাবন এবং ভূমিকম্পন। এছাড়াও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন—আগুন ও দালানধস অন্যতম। এর সঙ্গে উদীয়মান প্রতিকূল পরিবেশ যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের বিধ্বংসী সাইক্লোনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় সিঞ্চিত হয়ে বাংলাদেশ দুর্যোগজনিত নাজুকতা হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ লোক মারা যায়। সেখানে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ায় মারা যায় মাত্র ১৩৯ জন। জীবন-জীবিকা রক্ষাকল্পে দীর্ঘমেয়াদি তাত্পর্যপূর্ণ বিনিয়োগের মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলে অভিঘাতসহনশীল কাঠামো সৃষ্টি করে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
জনগণের জন্য আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে গণখাতের কর্মচারীদের জন্য সরকার বাড়ি এবং ফ্ল্যাট; নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন অন্যতম। অতিসম্প্রতি জমির প্রবল স্বল্পতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার হাইরাইজড ফ্ল্যাট তৈরি করে সামর্থ্য সাপেক্ষে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে Bangladesh-Pro-Poor Slums Integration Project-এর আওতায় ২০১৬ সালে সরকার আশ্রয় ও জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশের নির্বাচিত কিছু পৌরসভায় উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং নির্বাচিত এলাকাগুলো নিম্ন আয়ের অপ্রাতিষ্ঠানিক বসতি হিসেবে গণ্য করা হয়। এই প্রকল্পের মধ্যে আশ্রয় ও ঋণসহ মোট পাঁচটি অংশ আছে। বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক ঢাকা বস্তিবাসীদের জন্য ১ লাখ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ভাড়াভিত্তিক এই ফ্ল্যাটগুলো মিরপুর হাউজিং স্টেটে নির্মাণ করবে। এদিকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টের কাজ এগিয়ে চলেছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরবান লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিউশন (ইউএলজিআইএস) কর্তৃক অগ্রাধিকারমূলক পরিষেবা। একমাত্র ঢাকা শহরেই বসবাসকারী খানাগুলো প্রতিদিন ৬ হাজার টন বর্জ্য উত্পাদন করে। ঐতিহ্যগতভাবে কোনো খোলা অথচ অব্যবহূত জায়গায় আবর্জনার স্তূপ ফেলা হতো; কেবলমাত্র ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) পরিকল্পিত উপায়ে ও পরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধ বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট অবর্জনা ফেলা হয়। দেশে বিদ্যমান জমির স্বল্পতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ভস্মসত্কার করার মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা ভাবছে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) ডিএনসিসি, ডিএসসিসি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (এনসিসি) জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রকল্প পাশ করে।
ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও সিলেট সিটি করপোরেশনে অভিঘাত-সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। এর উদ্দেশ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়কৃত ও স্থানীয়ভাবে ঝুঁকি দমনের জন্য এক সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা (ডিআরএম)। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়াও এর মধ্যে থাকবে জরুরি অপারেশন সেন্টার, জরুরি পণ্যসামগ্রীর গুদাম, স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, জরুরি ব্যবস্থার জন্য ভারবাহী যন্ত্র, উদ্ধার কার্যক্রম ও জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতি ইত্যাদি।
বাংলাদেশ একটা এমবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি মান নির্ধারণ করেছে। অতীতে বায়ুদূষণ দূর করতে বা সহনীয় অবস্থানে রাখতে বেশ কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট নির্গত দূষণ সম্পর্কে ধারণা দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে আছে ঢাকা শহরে টু স্ট্রোক থ্রি হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ, পেট্রোল থেকে সিসা প্রত্যাহার, মোটরযানে সিএনজির ব্যবহার ও রূপান্তর প্রভৃতি। আরো আছে পাঁচ বছর পুরোনো গাড়ি বাতিল, নির্গতকরণ মান নির্ধারণ, ইটভাটা থেকে নির্গতকরণ হ্রাসকল্পে নীতিমালা গ্রহণ, হাই-সালফার কয়লার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং উন্নীত চুলার প্রসারের প্রচারণা। এভাবে নানা উদ্যোগের মাধ্যমে টেকসই শহর ও জনপদ গড়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
n লেখক :পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার