‘চাঁই’ জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ওদের

বাঁশের শলা দিয়ে তৈরি মাছ ধরার ফাঁদ ‘চাঁই’ তৈরি করে জীবনের মোড় ঘুরে গেছে তাদের। বলছিলাম কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ‘চাঁই গ্রাম’ নামে খ্যাত নাগরপুর গ্রামের কথা। চাঁই তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এই গ্রামের অনেক মানুষ। ছোট্ট এই গ্রামের লোকসংখ্যা মাত্র ৫ হাজার। গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ চাঁই বানানোর কাজে জড়িত।

জানা যায়, নাগরপুর গ্রামে পৌষ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত চাঁই বানানোর কাজ চলে। বৈশাখ মাসে বোরো ফসল ঘরে তোলার পর নদ-নদী, খাল-বিলে পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে নিকলী উপজেলার হাওরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ চাঁই দিয়ে মাছ শিকারের কাজে নেমে পড়েন। জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক—এই ছয় মাস হাওরের লোকজন মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত চাঁই বিক্রি হয়ে থাকে। নাগরপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি তালু মিয়া (৮৫), আবু তালেব (৮০) ও আ. আজিজ মিয়া (৯০) জানান, ঐ গ্রামের হাজি কালো মিয়া, হাজি মন্নাফ মিয়া ও নসু মিয়া প্রায় ৮০ বছর আগে মাছ ধরতে বাঁশের তৈরি ঢোলা নদীর পাড়ে বা বিভিন্ন খালের মুখে পেতে রাখতেন। কিছু সময় পর ঐ ঢোলা পানি থেকে তুলে দেখতেন তার ভেতরে প্রচুর মাছ। এরপর তাদের দেখাদেখি গ্রামের আরো অনেকেই এভাবে মাছ শিকার শুরু করেন। বছরের পর বছর এভাবে ঢোলা দিয়ে মাছ শিকার করতে করতে একসময় তারা বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার চাঁই বানানোর কৌশল রপ্ত করে নেন। হাওরাঞ্চলের লোকজন বর্ষার ছয় মাস বেকার বসে না থেকে নাগরপুর গ্রামে বানানো চাঁই দিয়ে মাছ শিকার করে সংসার চালান। এ কারণে নাগরপুরের চাঁইয়ের চাহিদা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে এখানকার চাঁই তৈরির কারিগরেরা হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশের মত্স্যজীবীদের চাহিদামতো চাঁই তৈরি করে দিতে পারেন না। আগাম টাকা নিয়ে এসেও অনেকে চাঁই না পেয়ে খালি হাতে  ফিরে যান।

নাগরপুর গ্রামে পাঁচ ধরনের চাঁই বানানো হয়। এগুলো হলো চিংড়ি চাঁই, শিং মাছের চাঁই, টেংরা মাছের চাঁই, কুঁচে ধরার চাঁই ও সাধারণ মাছের চাঁই। ব্যাপক চাহিদার কারণে বর্তমানে কুঁচে ধরার চাঁই বেশি তৈরি হয়। চাঁই বানানোর প্রধান উপকরণ হলো বাঁশ ও নাইলনের সুতা। এই চাঁই ব্যবহারের বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমে নদী-নালা, খাল-বিল বা হাওরের সুবিধাজনক স্থানে পানিতে বাঁশ পোতা হয়। এরপর বিশেষ কায়দায় চাঁইগুলো পানির নিচে বাঁশের সঙ্গে রেখে চলে মাছ শিকারের কাজ। মাছ চাঁইয়ের মধ্যে একবার ঢুকে পড়লে আর বের হতে পারে না। মাছ কিংবা কুঁচে ধরার চাঁই বানাতে প্রথমে বিভিন্ন মাপের বাঁশের শলা তুলে সেগুলো রোদে শুকিয়ে তারপর শুরু হয় চাঁই তৈরির প্রক্রিয়া। চাঁইয়ের কারিগর নুরুল ইসলাম, মবিন মিয়া, আলাউদ্দিন, জুয়েল মিয়া, বাচ্চু মিয়া, বাশার উদ্দিন, বুরহান উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী, রুবেল মিয়া ও লিয়াকত আলী বলেন, এই গ্রামে চার শতাধিক চাঁই ব্যবসায়ী আছেন। তারাই এই গ্রামের চাঁইয়ের মূল কারিগর। তাদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন ঐ গ্রামের আরো প্রায় ১ হাজার মানুষ। একজন কারিগর সারা দিনে পাঁচটি চাঁই বানাতে পারেন। আলাউদ্দিন (৮০) বলেন, তিনি এ বছর প্রায় ৫ হাজার চাঁই বানিয়েছেন। তার হিসাবে প্রতি বছর এই গ্রামে কম করে হলেও ৫ লাখ চাঁই তৈরি হয়। আলাউদ্দিন বলেন, ‘চিংড়ি মাছের একটি চাঁই তৈরি করতে সব মিলিয়ে ৮০ টাকা খরচ হয়। আমরা বিক্রি করি ১৩০ টাকায়। আমি এবার এ ব্যবসায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। আশা করছি সব খরচ বাদ দিয়ে ৮০-৮৫ হাজার টাকা লাভ থাকবে।’ জুয়েল মিয়া বলেন, সাধারণ মাছের চাঁই বিক্রি হয় ১১০ টাকায়, শিং মাছের ১০০ টাকায় আর টেংরা মাছের চাঁই বিক্রি হয় ১১০ টাকায়। গ্রামে আগে কয়েকটি টিনের ঘর ছিল, বর্তমানে গ্রামের সবাই টিনের ঘরে ঘুমান। কেউ কেউ পাকা দালানও তুলেছেন। গ্রামের আট শতাধিক পরিবারের ঘরে কুপিবাতির বদলে জ্বলছে সৌরবিদ্যুতের বাতি।

চাঁইয়ের ব্যাপক চাহিদার কারণে সিংপুর বাজার, জালালপুর, নিকলী বাজার ও পার্শ্ববর্তী উপজেলা মিঠামইনে গড়ে উঠেছে জমজমাট বাঁশের হাট। মোড়ল ও মুলি বাঁশ ছাড়া ভালো চাঁই তৈরি করা যায় না। পৌষ মাস থেকে পুরোদমে শুরু হয়ে যায় চাঁই বানানোর কাজ। চৈত্র মাস থেকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, বাজিতপুর, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ভৈরব ও কুলিয়ারচর উপজেলা এবং নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ ও মদন উপজেলার পাইকারেরা এই গ্রামে এসে নৌকা বোঝাই করে চাঁই নিয়ে যান। সিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম বলেন, নাগরপুর হলো সিংপুর ইউনিয়নের একটি কুটিরশিল্প গ্রাম। নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামছুদ্দিন মুন্না বলেন, ‘এই কুটিরশিল্পে সহায়তায় সরকারিভাবে যে ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার দরকার, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা পূরণ করার চেষ্টা করব।’