ইসলামে সন্ত্রাস ও হানাহানির স্থান নেই

 

‘জ্ঞানই শক্তি’। প্রাচীন কালের ক্ষুরধার তরবারি বা আধুনিক সমরাস্ত্র কোনটাই শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন অপেক্ষা মূল্যবান নয়। দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন ‘না জানার কারণে মানুষ ভুল করে’। তাইতো সঠিক পথে চলার জন্য মানুষকে জ্ঞান লাভে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাতে হবে। আরবি শব্দ ‘সলম’ থেকে উত্পন্ন ‘ইসলাম’ অর্থ ‘শান্তি’ ছাড়াও এর অন্য একটা পরিভাষাগত অর্থ হল- সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পিত হওয়া; আল্লাহকে খুশি করার জন্য সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা বা না করা। 

মুসলমানদের প্রধান দায়িত্ব-কর্তব্য হল:১. আল্লাহর হক ও ২. সৃষ্ট জীবের হক আদায় করা । সুতরাং কোনো অবস্থাতেই তার একজন অনুসারী অন্যের হক নষ্ট করার অধিকারী নয় । শান্তির ধর্ম ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল  ‘সত্ কাজের নির্দেশ দান ও অসত্ কাজে বাধা প্রদান’ করে অপরাধমুক্ত, সুখী ও সমৃদ্ধশালী কল্যাণ সমাজ গঠন করা। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব মানবতার দীপশিখা প্রজ্বলনকারী, সৌহার্দ-সমপ্রীতিময় সুখী সমাজের প্রবর্তনকারী, বিশ্বময় সাড়া জাগানো যুগান্তর সৃষ্টিকারী ধর্ম ইসলাম সর্বক্ষেত্রে সব সময় মধ্য পন্থা অবলম্বনের পক্ষপাতি; ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে কেবল একাগ্রতা, বিশ্বাসে অটল থাকা, নমনীয়তা, আন্তরিকতা, অবিচলকর্তব্যপরায়ণতা, ইত্যাদি স্বভাবসিদ্ধ গুণাবলীর ফলেই অর্জিত হয়েছে মহাবিজয়। মহানবী (স) ছিলেন সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলীর জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি কখনই তাঁর জানী শক্রর সাথেও উগ্র ব্যবহার করেননি। হুদায়বিয়ায় মুশরিকদের নেতৃত্ব দানকারী কোরায়েশ নেতা সোহায়েলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, মক্কীজীবনে স্বজাতির অসহনীয় অত্যাচার, ইহুদি পাওনাদারের দূর্ব্যবহার, মসজিদে নববীর মধ্যে বিধর্মী আরব বেদুঈনের পেশাব করা, কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে শক্রর আস্ফাালন, চরম সময়ে প্রমাণিত মুনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইসহ অনেকের বিশ্বাসঘাতকতা ও শক্রপক্ষের হাজারো বিরূপ আচরণ তাঁকে কোনো অবস্থাতেই উত্তেজিত করতে সক্ষম হয়নি বরং চরম ধৈর্যের সাথে সকল বিরুপ পরস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর রহমতে তিনি মুসলমানদেরকে সত্ পথে পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্বইতিহাসে সর্বাপেক্ষা সফল ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে চিরস্থায়ী আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি রক্তপাতহীন মক্কাবিজয়ের পর চরম শক্রদেরকেও সাধারণ ক্ষমাঘোষণা করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবনকে মহিমান্বিত করেছেন; চিরশক্র আবু সুফিয়ানকে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং তার ঘরে জীবন নাশের ভয়ে সন্ত্রস্ত আশ্রয়প্রার্থী কোরায়েশদেরকে অভয় দিয়ে ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে অবিস্মরণীয় হয়েছেন। যুদ্ধগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রমাণিত হবে, আগে মুসলমানেরা আক্রমণ করেননি, সর্বক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়ে প্রতিরোধে বাধ্য হয়েছেন মাত্র।

পবিত্র আল-কোরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা সন্ত্রাস ও জঙ্গি তত্পরতার বিষয়ে ঘোষণা করছেন: ‘নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল’ [সূরা মায়িদা : ৩২]।  ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা’ [সূরা আরাফ :৫৬]। ‘যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে লা’নত এবং মন্দআবাস’ [সূরা রা’দ : ২৫]। ‘ফিতনা অর্থাত্ প্রলোভন, দাঙা, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, শিরক, ধর্মীয় নির্যাতন ইত্যাদি হত্যা অপেক্ষা গুরুতর’ [সূরা বাকারা :১৯১]। রাসুলুল্লাহ (স) উপর্যোপরি তিন বার আল্লাহর কসম করে বলেছেন ‘ঐ ব্যক্তি মুমিন নয় যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়’ (বুখারি ও মুসলিম)।

অতএব, ইসলামে সন্ত্রাস ও হানাহানির স্থান নেই। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের অন্যতম প্রধান উপায় হল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর ভিত্তিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করা। এজন্য ফিত্রাতের ধর্ম ইসলাম দরদী সমাজ গঠনে প্রাথমিক স্তরে মূলত প্রত্যেক ব্যক্তির নৈতিক, আদর্শগত মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ ও তা কার্যকরীকরণের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।

lলেখক : মানবসম্পদ ও আর্থিকপরামর্শক। প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা সিটি কলেজ,

জেনারেল ম্যানেজার-নাভানা গ্রুপ ও পরিচালক (প্রশাসন)-হামদর্দ