আজকাল আমাদের দেশের প্রায় সকলেই রাস্তার হক প্রতিনিয়ত নষ্ট করে চলেছে। কেউ কেউ বাড়ি—ঘর নির্মাণ করতে গিয়ে রাস্তায় ইট-বালু রাখে, অনেকেই ময়লা-আবর্জনা ফেলে, গ্রাম এলাকায় গরু-মহিষ বেঁধে রাখে, শহর এলাকায় নানা নোংরা বস্তু ফেলে রেখে পথচারীদের ভোগান্তির মধ্যে ফেলে। অথচ রাস্তার হক সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (স) এরশাদ করেছেন, ‘ঈমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হলো, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা।’ (বোখারি ও মুসলিম)। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। শুধু তাই নয়, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কিছু সরানো পাপমুক্তিরও একটি মাধ্যম। বিশ্বনবী (স) এরশাদ করেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তায় চলতে চলতে একটি কাঁটার ডাল পেল, সে তা সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই কাজের কদর করলেন এবং তাকে পাপমুক্ত করে দিলেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা ঈমানের শাখা, পাপমোচন, সত্কর্ম এবং সদকাও। একজন মুসলমানের জন্য সমাজ কল্যাণমূলক গুরুত্বপূর্ণ যতগুলো সত্কর্ম আছে তার মধ্যে রাস্তার আদবও একটি। নবী করিম (স) বলেছেন, ‘একদা আমার কাছে উম্মতের ভালো ও মন্দ আমল পেশ করা হলো। এর মধ্যে ভালো আমলগুলোর অন্তর্ভুক্ত একটি আমল দেখলাম, তা হচ্ছে পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা।’ (মুসলিম)
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স) এরশাদ করেন, ‘মানবদেহে ৩৬০টি গ্রন্থি আছে। প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ওই গ্রন্থিগুলোর তরফ থেকে সদকা করা উচিত। সাহাবায়ে কেরাম (রা) জিজ্ঞেস করলেন, এত সদকা দিতে কে সক্ষম হবে হে আলাহর রাসুল (স)? তিনি বললেন, মসজিদ থেকে নোংরা জিনিস দূর করা, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা একটি সদকা। যদি তাতে সক্ষম না হও, তবে দুই রাকাত চাশতের নামাজ তোমার সে প্রয়োজন পূর্ণ করবে।’ (আহমাদ, আবু দাউদ)। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (স) এরশাদ করেন, ‘ তোমরা রাস্তার ওপর বসা থেকে দূরে থাকো। তা শুনে সাহাবায়ে কেরাম (রা) আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (স)! কিন্তু রাস্তায় না বসলে তো উপায় নেই। যেহেতু আমরা সেখানে বসে কথাবার্তা বলে থাকি। আল্লাহর রাসুল (স) বললেন, তোমাদের রাস্তায় বসতে যদি একান্তই প্রয়োজন পড়ে তাহলে রাস্তার হক আদায় করো! সাহাবায়ে কেরাম (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, রাস্তার হক কী? তিনি (স) বললেন, চক্ষু অবনত রাখা, মানুষকে কষ্টদান থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেওয়া এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
রাস্তার হক নষ্ট করা, পথচারীদের কষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হজরত মু’আজ ইবনে জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, বিশ্বনবী (স) এরশাদ করেন, ‘তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচো। আর তা হলো ওজু-গোসলের স্থানে, মাঝ রাস্তায় এবং ছায়াদার গাছের নিচে মল-মূত্র ত্যাগ করা।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তারগিব)। নিশ্চয়ই এই কাজগুলো পথযাত্রীদের জন্য কষ্টদায়ক। রাস্তায় নোংরা জিনিস ফেললে পায়ে হাঁটায় অনেক অসুবিধা হয়। আর গাছের ছায়ায় যারা আরাম করে তাদের জন্যও কষ্টকর। আল্লাহর রাসুল (স) এসব ঘৃণ্য কাজকে নিষিদ্ধ করেছেন, যাতে পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারে এবং আরাম করতে পারে। এ জন্য আমাদের সকলকে পথিকদের কষ্ট ও অসুবিধার কারণ হয় এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। রাস্তার হক আদায়ের ক্ষেত্রে সকল মুসলমানের জন্য ইসলামের দিকনির্দেশনা মান্য করা জরুরি।
lলেখক :আলেম ও গবেষক
০