l সুমন্ত গুপ্ত
এ যেন শাপলার রাজ্য। লতা-পাতা-গুল্মে ভরা বিলের পানিতে শত সহস্র লাল শাপলা হার মানিয়েছে সূর্যের আভাকেও। বিলের জল প্রায় দেখাই যায় না। সবুজ পাতার আচ্ছাদনে ঢাকা পড়েছে বিস্তীর্ণ জলরাশি। লাল শাপলার হাসি যেন যেকোনো মানুষেরই মনের দুয়ার খুলে দেয়। বন্ধুরা, আমি বলছি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত পাশাপাশি চারটি বিলের কথা। সেখানে দেখা মিলবে চোখজুড়ানো এমন দৃশ্যের। বিলগুলো এ রকম অপরূপ সাজে সেজে রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এই বিল পরিচিত ‘ডিবি বিল’ নামে। অন্য তিনটির নাম হলো কেন্দ্রী বিল, হরফকাটা বিল ও ইয়াম বিল। চারটি বিলের অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে। প্রথমে এই বিলের খবর পাই ফটো সাংবাদিক আনিস মাহামুদের কাছ থেকে। এখনো এই বিলগুলো ভ্রমণপিপাসুদের চোখে পড়েনি।
এবারের ভ্রমণসঙ্গী আমার মা। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিল। আগে থেকে বলে রাখা ভালো, বিলের আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে বেলা পড়ার আগে যেতে হবে। আমাদের পৌঁছাতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল। যাত্রাপথে প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার মন কেড়ে নেবে। গন্তব্য স্থলে পৌঁছে দেখা পেলাম এক অপরূপ দৃশ্যের। দূর থেকে দেখলাম সবুজের মধ্যে অসংখ্য ক্ষুদ্র লাল বৃত্ত। দেখে ঠাহর করা দুরূহ, জিনিসগুলো আসলে কী? দূরত্ব কমার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফুলের অস্তিত্ব। আগাছা আর লতা-পাতা-গুল্মে ভরা বিলের পানিতে শত-সহস্র লাল শাপলা। পুব আকাশে সূর্যের লাল আভা যেন হার মেনেছে রক্তিম শাপলার কাছে। প্রকৃতির বুকে আঁকা এ যেন এক নকশি কাঁথা। বিলের যত ভেতরে যাওয়া যায়, ততই বাড়তে থাকে লালের আধিক্য। বিলের পাশে যারা থাকে, তারা এই বিলের ওপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করে। দেখলাম একজন নারী শাপলা তুলছেন। অনুরোধ করায় তিনি রাজি হলেন ডিবির বিলের আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। নাম জিজ্ঞাসা করলে বললেন, ‘সুচিত্রা দেবী।’ তিনি জানালেন, এ বিলে ঠিক কবে থেকে শাপলা জন্মাতে শুরু করেছে, তা নিয়ে নেই সঠিক কোনো তথ্য। তবে মুরব্বিদের কাছ থেকে জেনেছেন, জন্মের পর থেকেই এভাবে শাপলা ফুটতে দেখেছেন তারাও। প্রায় ৭০০ একর জায়গায় বিস্তৃত এ চারটি বিল। পুরো বিল ঢাকা পড়েছে শাপলায়। শাপলা ফোটে রাতের স্নিগ্ধতায়, আর দিনের আলোতে আস্তে আস্তে বুজে যায়। একটি শাপলার স্থায়িত্ব সাত দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। শাপলা ‘নিমফিয়েসি’ গোত্রের দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nymphacaae. ইংরেজি নাম-Water Lili. উদ্ভিদ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শাপলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম দ্বিবীজপত্রী হিসেবে গণ্য করা হয়। ‘শাপলা’ শুধুই যে সৌন্দর্যের প্রতীক, তা নয়। এর ঔষধি উপকারিতাও রয়েছে। পুকুরে বা বিলে যখন আলো করে শাপলা ফুটে থাকে, তখন সেই রূপের সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো ফুলের সৌন্দর্যের তুলনা করা যায় না। সত্যিই এই শাপলার হাসি অতুলনীয়!
এখানে একদিকে লাল শাপলার সমারোহ, অন্য দিকে মেঘালয় কন্যার অপরূপ রূপ, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এর পর আমরা গেলাম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে। এখানকার অধিবাসীরা বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির গাছ লাগিয়েছেন। ওপর প্রান্তে দেখা যায় ভারতের খাসিয়া অধিবাসীদের সুপারি ও কমলার বাগান। তবে ভুলেও কেউ সাহস দেখিয়ে ও-দিকে পা বাড়াবেন না যেন।
এর পর গেলাম ডিবির বিলে নৌকায় ঘুরতে। বিলের ভেতরে নৌকায় করে ঘোরার মজাই আলাদা। আমরা দেখা পেলাম বিলের একমাত্র মাঝি শ্রীদাম বিশ্বাসের। তিনিই ডিবির বিল ঘুরিয়ে দেখালেন। এরপর আমরা গেলাম বিল অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা দেখতে। সুচিত্রা দিদি নিয়ে গেলেন তাদের বস্তিতে। এখানকার নারীরা হাতের কাজ করেন। বাঁশের টুকরি, ডালা, কুলা তৈরি করেন। ডিবির বিল এলাকায় এখনো বিদ্যুত্ পৌঁছায়নি। তবে কিছু বাসায় সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুতের বাবস্থা করা হয়েছে। আর খাওয়ার পানির জন্য এখনো সুগভীর ইন্দিরার ওপর নির্ভরশীল এই এলাকার মানুষজন। তাদের আতিথেয়তা আমাদের অবাক করে দিল। শহরে এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যিনি সারাদিনই একদল অচেনা ভ্রমণপিয়াসীর পেছনে ব্যয় করবেন। গোধূলি লগ্নে আমরা ফিরে চললাম শহুরের দিকে।
যাবেন কীভাবে
সিলেট শহরের বন্দর বাজার পয়েন্ট থেকে জৈন্তাপুর বাজারের পর কিছুদূর গেলে দেখা যাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ডিবির হাওরে বিশেষ ক্যাম্প। ঐ পথ ধরে কিছু দূর গেলে দেখা মেলবে বিলের। বাস/সিএনজি/প্রাইভেট গাড়ি করে যেতে সময় লাগবে এক ঘণ্টার মতো।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বিলের আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে রোদের তীব্রতা বাড়ার আগেই যাওয়া উচিত। সঙ্গে হালকা খাবার ও পানি নিয়ে যাওয়া ভালো। রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচার জন্য ছাতা নেওয়া যেতে পারে। তবে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল—এ রকম জিনিস যেখানে সেখানে ফেলে বিলের পরিবেশ নষ্ট করবেন না।