বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আধার পাহাড়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় এবং পাহাড়ে অবস্থিত বনজঙ্গল, পশু-পাখি, জীবজন্তু—সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে ও নির্বিচারে পাহাড় কাটিবার পরিণতি কখনো শুভ হয় না। আমাদের দেশে পাহাড় কাটিয়া বসতি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে অনেক সময় হিড়িক পড়িয়া যায়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, প্রভাবশালী-অপ্রভাবশালী ব্যক্তিরা পর্যন্ত পাহাড় কাটিয়া সাবাড় করিয়া দিলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিরা তাহা দেখিয়াও যেন না দেখিবার ভান করেন। এইভাবে পাহাড় কাটিবার ফলে সেখানকার জলবায়ু, মাটি, পানি ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়িয়া থাকে। মানুষের এসব অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃতি তাহার স্বাভাবিক গতিধারা হারাইয়া ফেলে। ইহার প্রতিক্রিয়ায় পাহাড় ধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
সম্প্রতি অভিযোগ উঠিয়াছে যে, লালপাহাড়ি ক্যাম্পাস বলিয়া পরিচিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনকে কেন্দ্র করিয়া কেন্দ্রীয় মাঠের পাহাড় কাটা হইতেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র না নিয়া কীভাবে এই পাহাড় কাটা হইতেছে, তাহা বোধগম্য নহে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য হইল—পাহাড় কাটিবার কোনো অনুমতি দেওয়া হয় নাই। অথচ ইহার আগেও একটি আবাসিক হলের পাশের পাহাড় মেশিনের সাহায্যে কাটিয়া নির্মাণাধীন সড়কদ্বীপ ও ডরমিটরির নিচু স্থান ভরাট করা হইয়াছে। ইতিপূর্বে পাহাড়খেকোদের কবলে পড়িয়া কেবল চট্টগ্রামেই গত এক দশকে নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে ৩৫টি পাহাড়। অন্তত আরো ১৫৬টি পাহাড় ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। অনেক সময় পাহাড় হইতে আসা বালিতে চট্টগ্রাম নগরীর নালা-নর্দমা ভরাট হইয়া সৃষ্টি করে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। ২০০৭ সালে মর্মান্তিক পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ নির্ণয় করিয়া ৩৬ দফা সুপারিশ করে; কিন্তু সেগুলি আজও বাস্তবায়িত হয় নাই।
বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, একটি পাহাড়ের দৃঢ়তা নির্ভর করে সেই পাহাড়ের মাটির স্তরভেদের গঠন বিন্যাসের উপর। আমাদের দেশের ভূ-প্রকৃতির গঠনবৈচিত্র্য অনুযায়ী পাহাড়িয়া অঞ্চলগুলি পাললিক শিলার স্তর দিয়া গঠিত যাহা সহজেই ভঙ্গুর প্রকৃতির। বসতি ও চাষাবাদের জন্য পাহাড়ের উঁচু স্তরের শক্ত মাটির আবরণ কাটিয়া ও গাছপালা কাটিয়া ফেলিলে সামান্য বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি ধসিয়া পড়ে। পৃথিবীর সারফেসে ভূমিকম্পের প্রভাবে পাহাড়ের ভিতরের স্তরে ধীরে ধীরে ভূ-ফাটল বাড়িতে থাকে। আমাদের দেশে পাহাড়-টিলা সংরক্ষণ করিয়া কীভাবে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা যায় তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। একান্ত প্রয়োজনে পাহাড় কাটিতে হইলেও নিয়মকানুন মানিয়াই কাটিতে হইবে, যত্রতত্র কাটা যাইবে না। ২০১০ সালের পরিবেশ আইনের মাধ্যমে পাহাড় কাটাকে একটি অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হইয়াছে। এই আইনেরও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাহাড় রক্ষায় দীর্ঘ শেকড়ধারী গাছ রোপণ এবং টাইটিনিয়াম অক্সাইড, ক্রোমিয়াম অক্সাইড, সিলিকন কার্বাইডসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়িমাটির দৃঢ়তা বাড়ানো যাইতে পারে।