সোলেইমানির মৃত্যু এবং পরবর্তী অস্থিতিশীলতা

 

সাদিক আল আমিন

নতুন বছর শুরু হতে না হতেই শুনতে হলো দুঃখের সংবাদ। ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে গত তিন জানুয়ারি হত্যা করা হয়েছে। তবে সংবাদটি সবার জন্য প্রকৃত দুঃখের নাও হতে পারে। কারো ক্ষেত্রে তা উল্লাসের। অন্তত মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির অনুসারীদের ক্ষেত্রে তা অবশ্যই একটি আনন্দের সংবাদ। বহুদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আসছে। বিভিন্ন দফায় ইরান মার্কিন সৈন্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তারই ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এই হামলার ঘোর বিরোধিতা করেছে। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও ডেমোক্র্যাটিকের সদস্য ন্যান্সি পেলোসির দাবি, মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা না করে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত হয়েছে। তবে ট্রাম্প ভিন্ন কথাই বলেছেন। তার ভাষ্যমতে, ‘সোলেইমানি দীর্ঘ সময় ধরে হাজারো মার্কিন নাগরিককে হত্যা করেছেন এবং আরো হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় নিহত অনেক বিক্ষোভকারীসহ লাখো মানুষের মৃত্যুর জন্য সোলেইমানি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।’ ট্রাম্পের এই তর্জনী তোলা কতটুকু সত্য তা যাচাইয়ের অপেক্ষা রাখে।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি। জানা যায় যে, তিনি একমাত্র খামেনির কাছেই জবাবদিহি করতেন এবং সব ধরনের সশস্ত্র ও গোয়েন্দা কার্যক্রম নিজেই দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতেন। এমনকি ইরাকের সামরিক বাহিনীতেও তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। সোলেইমানির কুদস ফোর্সের সহায়তায় ইরাকের সামরিক বাহিনী ইসলামিক স্টেটের (জঙ্গিগোষ্ঠী) বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে লড়াই করে আসছে। সোলেইমানির বিয়োগান্তে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কানিকে কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি। সোলেইমানির মৃত্যুতে তেহরান, কারমানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। ড্রোনের সাহায্যে সোলেইমানির গাড়িবহরে ইরাকে হামলা করা হলে সোলেইমানিসহ ১২ জন নিহত হন। ট্রাম্পের এ অপক্ব সিদ্ধান্তে পালটে যেতে পারে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বিদ্বেষের বীজ দানা বাঁধতে পারে। এরই মধ্যে সোলেইমানির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে যাবার পরপরই বিশ্ব তেলের বাজারে দর ৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, এই আশঙ্কায় তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।

সোলেইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্পের গুরুতর একটা ভুল বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান ছেড়ে দেবার পাত্রের ভূমিকায় রয়েছে বলে মনে হয় না। ইরাকও এ বিষয়ে ইরানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। লেবানন ও ফিলিস্তিন ইরানকে পূর্ণ সমর্থন করবে। যেহেতু লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের জিহাদিদের হাতকে শক্ত করেছিলেন সোলেইমানি। এছাড়াও তিনি সিরিয়া ও ইরাকযুদ্ধে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন মার্কিন সেনাদের, সিরিয়ার সামর্থ্য না থাকলেও কৌশলগত সমর্থন দিতে থাকবে ইরানকে। কিছুদিন আগে ট্রাম্প নিম্নকক্ষে অভিশংসিতও হয়েছিলেন। তবে মার্কিনদের জন্য এ পদক্ষেপ হতে পারে ভয়ংকর। তেলসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অন্যান্য আমদানিকৃত পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইরান এতোটা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে যে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও তা আশ্চর্যের বিষয় হবে না। উত্তেজনা যেন আরো না বাড়ে সেজন্য উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে চীন। তবে আদৌ কি ইরান চুপ থাকবে নাকি প্রতিশোধের চরম বিদ্রোহ নিয়ে মাঠে নামবে তা শুধু দেখার বিষয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ

 দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়