সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। এতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো থাকলেও শুধু জনবলের সংকটের কারণে পোড়া রোগীদের চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। উদ্বোধনের এক বছর পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। ১৬টি অধ্যাপকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র পাঁচ জন। ৬৪০ জন নার্সের বিপরীতে আছেন মাত্র ৭০ জন। ২০০ মেডিক্যাল অফিসারের পদ থাকলেও আছেন মাত্র ৩১ জন। ৪০ জন রেজিস্ট্রার-সহকারী রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য।
চিকিত্সকেরা জানান, একশ্রেণির আমলার কারণে এই ইনস্টিটিউটে জনবলের সংকট কাটছে না। মূল্যবান যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং বিএনপি-জামায়াতের আগুন-সন্ত্রাসের পর বিশ্বমানের অভিজ্ঞ ডাক্তার-নার্সের সমন্বয়ে একটি অত্যাধুনিক বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠা হয় এবং তিনি এটি উদ্বোধন করেন।
সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ১৮ তলাবিশিষ্ট এ ইনস্টিটিউটের মাটির নিচে তিনতলা বেজমেন্ট। সেখানে গাড়ি পার্কিং, রেডিওলজিসহ আরো কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভাগ রাখা হয়েছে। ইনস্টিটিউটটিতে ৫০০ শয্যা, ৫০টি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ১২টি অপারেশন থিয়েটার ও অত্যাধুনিক পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড আছে। ব্যথা ও জীবাণুমুক্ত ড্রেসিং রুমও রয়েছে। কানাডা থেকে আনা হয়েছে লাইভ ইমেজিং সিস্টেম নামে একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র, যার মাধ্যমে পোড়া রোগীর কী অবস্থা তা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করে দেশে চিকিত্সা করা যাবে। আছে অত্যাধুনিক বোন কেয়ার সেন্টার। এই সেন্টারে স্টেমসেল থেরাপির মাধ্যমে বাতসহ আরো অনেক ধরনের হাড়ের রোগ নিরাময় সম্ভব।
বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তিনটি। এগুলো হলো :শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল ও প্রশাসনিক। এমএস প্লাস্টিক সার্জারি ও এফসিপিএস প্লাস্টিক সার্জারি কোর্স চালু রয়েছে। প্রতি বছর বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক এখান থেকে বের হচ্ছেন। বর্তমানে পঞ্চম ব্যাচ চলছে। এই কোর্সগুলোর জন্য অভিজ্ঞ চিকিত্সকের কোনো বিকল্প নেই। ইতিপূর্বে প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ খন্দকার অবসর নিয়েছেন। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে অবসর নেবেন প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জন ও ইনস্টিটিউটের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম। জোড়া শিশু তোফা-তহুরার অপারেশন ও মানিকনগরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কবির হোসেন ভূঁইয়ার গালের জটিল টিউমার অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করেন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম। এ ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা চলে গেলে চিকিত্সা শিক্ষায় বড়ো ধরনের শূন্যতা দেখা দেবে বলে শিক্ষার্থীরা জানান।
চিকিত্সাসেবা নির্বিঘ্ন্নে করতে পুরো হাসপাতালকে ৯টি ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। রয়েছে ১০টি আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, যার মধ্যে চারটিতে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এই ইনস্টিটিউটে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্কিন ব্যাংক চালু হয়েছে। বেশি পোড়া রোগীদের চিকিত্সার ক্ষেত্রে এটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। এখানে (স্কিন ব্যাংকে) মৃত ব্যক্তির চামড়া বা ত্বক সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেই চামড়া পোড়া রোগীদের প্লাস্টিক সার্জারি, অ্যাসিডদগ্ধ রোগীর চিকিত্সায় ব্যবহার করা হবে। এছাড়া এটি বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি হাসপাতাল, যেখানে রয়েছে হেলিপ্যাড। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কিছুদিন আগেও জনবলের সংকট ছিল। নতুন করে সাড়ে ৪ হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেওয়ার কারণে এখন বার্ন ইনস্টিটিউটে মেডিক্যাল অফিসার পদে বদলি করে দেওয়া হবে। তবে চাহিদার তুলনায় দেওয়া সম্ভব হবে না।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, জনবল বাড়াতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে কয়েক দফা আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সাড়া মেলেনি। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণে সীমিত জনবল দিয়ে সাধ্যমতো সর্বাত্মক চিকিত্সাসেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ বিভিন্নভাবে দগ্ধ হয়। তাদের ৯৯ ভাগেরই প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হয়। পোড়া ও প্লাস্টিক সার্জারির চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পোড়া রোগীদের কারো কারো হাত, পা, শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ বেঁকে যায়। এক্ষেত্রে তাদের প্লাস্টিক সার্জারি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এই সার্জারি করার পর তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। এছাড়া দুর্ঘটনায় আহতদের অনেকেরই প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হয়। এ ধরনের চিকিত্সার জন্য কমপক্ষে দেড় হাজার ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ সার্জন প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে রাজধানীর চাঁনখারপুলে ১ দশমিক ৭৬ একর জমিতে ৯১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করা হয়। আউটডোর, ইনডোর, অপারেশন ও জরুরি বিভাগ চালু আছে। এই বার্ন ইনস্টিটিউটকে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বার্ন হাসপাতাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শ্বাসনালি পোড়া রোগীদের জন্য ‘এইচভিওটি ইউনিট’ চালু আছে। বিভিন্ন কারণে ক্ষত হওয়াদের জন্য ‘উন্ড কেয়ার ইউনিট’ চালু আছে। আমেরিকা, ইতালি, সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ডসহ অনেক দেশের চিকিত্সকেরা এই ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করে বলেছেন, পোড়া রোগীদের জন্য এত বড়ো আইসিইউ বিশ্বের কোথাও নেই।