ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের সব কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিএনপি বলছে, ইভিএমের মাধ্যমে নতুন করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হচ্ছে। এই ইভিএম নীরব, নির্দেশিত, নিঃশব্দ, স্বয়ংক্রিয় ভোট চুরির প্রকল্প ছাড়া আর কিছু নয়। ইভিএমে প্রোগ্রামিংয়ের ওপর ফলাফল নির্ভর করছে। ভোটের ফলাফল নিয়ন্ত্রিত হবে প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে। গতকাল সোমবার বিকালে নির্বাচন ভবনে উত্তর-দক্ষিণ সিটির দুই মেয়র পদপ্রার্থীকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক করে।
দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদলের প্রধান ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তারা ইভিএমে ভোটের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন, ২০১৪ সালে একবার ভোটার ও প্রার্থীবিহীন নির্বাচন হয়েছে। ২০১৮ সালে মধ্যরাতে ভোট দিয়ে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। এবার নতুন পদ্ধতিতে ইভিএমের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হচ্ছে।
তবে বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ইভিএমে নীরবে কারচুপি হওয়ার সুযোগ নেই। ইভিএমে ভোটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং ইভিএম থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। এতে আগে প্রোগ্রামিং করার সুযোগ নেই। ভোটের আগে ভোটের টাইম মেশিনে সেট করে দেওয়া হয়। সকাল ৮টার আগে কেউ মেশিন খুলতে পারবে না। আবার ৫টার পরে ভোট দেওয়া যাবে না। ইভিএম অনলাইন সিস্টেম না, অফলাইন সিস্টেম। ফলে কোনো সমস্যা হবে না।
ইসির সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধিদলে ডিএনসিসি নির্বাচনে দলের মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ডিএসসিসিতে মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে আরো ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার ও বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। ইসির পক্ষে বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের পর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইভিএম দিয়ে আপনি কী ভোট দিয়েছেন, তা ভেরিফিকেশন করার কোনো সুযোগ নেই। এটি নিঃশব্দে ভোট চুরির একটি প্রক্রিয়া। সরকার যেমন ফল চাইবে, সেভাবে প্রোগ্রামিং করা থাকবে ইভিএমে। তারপর আপনি যাকেই ভোট দেন না কেন, ফল আসবে সেই প্রোগ্রামিং অনুযায়ী। বিএনপির এই নেতা বলেন, পৃথিবীর ২০০ দেশের মধ্যে মাত্র চারটি দেশে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এই চারটি দেশের সরকার ও নির্বাচন কমিশন কোনোটাই বিতর্কিত নয়। বাংলাদেশের সরকার ও নির্বাচন কমিশন দুটিই বিতর্কিত। ফলে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ইভিএম অন্তরায়। আমির খসরু বলেন, তারা ইসিকে বলেছেন, বিএনপি-সমর্থিত একজন কাউন্সিলর পদপ্রার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরেকজন প্রার্থী আপিল করতে গেলে তাকে অপহরণ করা হয়, গতকাল মুন্সীগঞ্জের আলুর খেতে তাকে পাওয়া যায়। আরেকজন নারী প্রার্থীর বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে নির্বাচন কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আমির খসরু বলেন, তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসি আশ্বস্ত করে বলেছেন, ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ঘটনা না ঘটলে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। পুলিশের অভিযান হবে না।
বিএনপির সূত্র জানায়, বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে ২১ দফা লিখিত দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে আছে নির্বাচনের সময় পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার থেকে বিরত থাকা, রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান স্থগিত রাখা, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বে নিরাপত্তা সেল করা, পোলিং এজেন্টদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
অন্যদিকে, বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে তারা (বিএনপি) আপত্তি করেছেন। আমরা তাদের বুঝিয়ে বলেছি, ইভিএম নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মেশিনে ভোট নেওয়া হলে যার ভোট তিনি দিতে পারবেন। এখানে ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। আমরা তাদের বলেছি, নির্বাচনে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। সিইসি বলেন, নানা কারণে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থায় কিছু অনিয়ম থেকে গিয়েছিল। সেসব থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা মেশিনে (ইভিএম) ভোট নিতে চাই। ইভিএমে প্রক্সি ভোট দেওয়া যায় না। একজন একবারের বেশি ভোট দিতে পারবে না। আমরা তাদের বলেছি, ইভিএমে নীরবে কারচুপি হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে প্রোগ্রামিং করার কোনো সুযোগ নেই।