যুদ্ধ নাকি যুদ্ধাবস্থা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। দেশ দুটির মধ্যে দ্বন্দ্বটা প্রায় চার দশক আগে শুরু হলেও এখনকার মতো এমন যুদ্ধংদেহি অনিশ্চিত অবস্থা আগে দেখা যায়নি। ইরানের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড়ো সমরবিদ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যেকোনো সময় এই উত্তেজনা সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান সরাসরি মার্কিন স্বার্থে আক্রমণ করতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা তাদের ‘প্রক্সি’ বাহিনী দিয়েও মার্কিন ঘাঁটি বা স্থাপনায় হামলা করতে পারে। এটা হলে নিশ্চিতভাবে পালটা আক্রমণ চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ছক তৈরি করে রেখেছে। ট্রাম্প নিজেই হুংকার দিয়েছেন যে ইরানের ৫২টি স্থাপনায় কঠোরভাবে হামলার প্রস্তুতি রয়েছে।

এমন অবস্থায় সরাসরি যুদ্ধ বাধলে তা ভয়াবহ রূপ নেবে। এই যুদ্ধ দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের পাশাপাশি তাদের ‘প্রক্সি’ বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র দেশের ওপর হামলা চালাতে পারে। এমন হলে অস্থির হয়ে উঠবে বিশ্বের তেলের বাজারও। বড়ো ধাক্কা আসবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, আরেকটি যুদ্ধের ধকল নেওয়ার মতো অবস্থায় বিশ্ব এখন নেই।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের শুরু যেভাবে

১৯৫৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেন যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের মোহাম্মদ রেজা শাহ             পাহলভি। এতে তাকে সহায়তা করে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন সৈয়দ রুহুল্লাহ মুসাওয়ি খোমেনি, যিনি পশ্চিমা বিশ্বে আয়াতুল্লাহ খোমেনি নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের নেতা। ঐ বিপ্লবের পর তিনি ইরানের সংবিধান রচনা করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই বিপ্লবের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ১৯৮০ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে হামলা, পালটা হামলা, দোষারোপের পালা চলতে থাকে।

পারমাণুবিক কর্মসূচিতে নতুন উত্তেজনা

দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র রূপ নিতে থাকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ হওয়া ঠেকাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে থাকেন। এই অবরোধের কারণে ইরান বর্তমানে কোণঠাসা বলা যায়। দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা হ্রাসে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে করা ঐ চুক্তি অনুসারে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রাখবে বলা হয়। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়।

ট্রাম্পের হাত ধরে এই উত্তেজনা

ইরানের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ট্রাম্প প্রশাসন আবারো তেহরানের ওপর একের পর এক অবরোধ দিতে শুরু করে। ইরান যাতে অন্য দেশের কাছে তেল বিক্রি করতে না পারে সেই অবরোধ দেয়। এর পালটা হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার ঘোষণা দেয়। গত জুনে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন ভূপাতিত করলে ট্রাম্প ইরানে হামলার অনুমতি দিয়েও পরে পিছিয়ে যান।

কিন্তু সর্বশেষ গত শুক্রবার ইরাকের বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন থেকে হামলায় ইরানের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়। ইরানিদের কাছে তিনি ‘জেমস বন্ড’ চরিত্রের মতোই কৌশলী, বুদ্ধিমান ও কঠোর। ফলে তার মৃত্যু ইরানের একটি সরকারের পতন বা বড়ো কিছু ধ্বংসের চেয়েও বিরাট কিছু। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করলেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সোলেইমানিকে হত্যার ভয়াবহ পরিণামের কথা চিন্তা করে পিছিয়ে যান। তাই প্রভবাশলী সোলেইমানির হত্যার পালটা জবাব দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই ইরানের সামনে!

কী করতে পারে ইরান?

বিশিষ্ট মার্কিন সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া বলছেন, সোলেইমানিকে হত্যার উদ্দেশ্য আমার কাছে স্পষ্ট নয়। সোলেইমানি একজন খারাপ ব্যক্তি ছিলেন, তাতে প্রশ্ন নেই। কিন্তু যেভাবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এ ঘটনা হলো তাতে মনে হচ্ছে, আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছি।

বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাসের মতে, যুদ্ধ বাধবে কি না সেটা একটি বড়ো প্রশ্ন। আরেক বিশ্লেষক জেরেমি বোওয়েন বলছেন, ইরান হয়তো প্রতিশোধ নিতে পারে। তবে সেটা সামনের দরজা দিয়ে নয়, বরং পাশের জানালা দিয়ে। অর্থাত্ পরোক্ষ কৌশলে যা সোলেইমানি নিজে ব্যবহার করতেন। সরাসরি হামলা না করলেও ইরানের প্রশিক্ষিত ও সমর্থিত কোনো মিলিশিয়া বাহিনী বা গোষ্ঠী মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। বিশ্বজুড়ে নিজেদের সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর মাধ্যমে প্রভাব ধরে রেখেছে ইরান। বেশির ভাগ বিশ্লেষক সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে ইরানের প্রক্সি হামলাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র হিসেবে আছে ইরাক, লেবানন ও সিরিয়া। আর এই অঞ্চলে বাইরে বড়ো মিত্র রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা। তবে ইরান বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ও আদর্শিকভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইয়েমেন ও গাজা উপত্যকায় ইরানের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্ক আর প্রভাব কি যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় তেহরানের জন্য যথেষ্ট? মোটেই তা নয়। কারণ ইরানকে চারদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বড়ো মার্কিন মিত্র সৌদি আরব ও ইসরাইল।

জেরেমি বোওয়েন বলছেন, ইরানের হাতে আধুনিক রকেট ও মিসাইল আছে। কিন্তু এসব অস্ত্র যদি তারা মার্কিন বাহিনীর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার জন্য ব্যবহার করে তাহলে পরিস্থিতি বরং খারাপ হতে পারে। তারা যদি উপসাগরে মার্কিন জাহাজে আক্রমণ চালায় সেটাও প্রচণ্ড পালটা হামলা ডেকে আনতে পারে। ইরানের তেল শোধনাগারগুলো পারস্য উপসাগরে উপকূলের পাশেই। যুক্তরাষ্ট্রের যে বিপুল সামরিক ক্ষমতা তাতে এগুলো খুব সহজ টার্গেটে পরিণত হবে। তাই ইরান কোন পথে এগোবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।