‘গীতি চন্দ্রাবতী’র সুর ছুঁয়ে গেছে দর্শকের মন

ময়মনসিংহ গীতিকায় যেসব নারী চরিত্র নাটকে স্থান পেয়েছে, তাদের মধ্যে খানিকটা হলেও ব্যতিক্রমী একজন চন্দ্রাবতী। নয়ান চাঁদ ঘোষ তার চন্দ্রাবতী নামক গীতিনাট্যে তুলে ধরেছেন চন্দ্রাবতী ও জয়ানন্দের প্রেমের বিয়োগগাথা। কথায় বলে, প্রেম মানে না জাত-কুল। ‘চন্দ্রাবতী’ নাটকেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

চন্দ্রবতীর ছোটবেলার খেলার সাথি জয়ানন্দ। অনাথ জয়ানন্দের সঙ্গে কিশোর বয়সে বিয়ে ঠিক হয় তাদের। বিয়ের ঠিক কয়েকদিন আগে জয়ানন্দের জীবনে ঘটে যায় এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। নদীর ঘাটে দেখা হয় মুসলিম কন্যা আসমানীর সঙ্গে। আসমানীর রূপে মজে জয়ানন্দ; প্রেমে হয় মাতোয়ারা। আসমানীর প্রেমে জাত-কুলের কথা ভুলে যায় সে। বাড়িতে ফিরে মনে পড়ে ছোটবেলার খেলার সাথি চন্দ্রাবতীর কথা। দোটানায় পড়ে যায়। কী করবে, ভেবে পায় না সে। এদিকে চন্দ্রাবতী ও জয়ানন্দের বিয়ের কথা কানে আসে আসমানীর। সে ক্ষিপ্ত হয়ে নালিশ জানায় কাজির দরবারে। কাজি জয়ানন্দকে ধরে আনার আদেশ দেয় এবং নিজ ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হয়ে আসমানীকে বিয়ের নির্দেশ দেয়। জয়ানন্দ বাধ্য হয় বিয়ে করতে। ওদিকে চন্দ্রাবতীর বিয়ের লগ্ন পেরিয়ে যায়। লগ্নভ্রষ্টা কন্যাকে নিয়ে বিপদে পড়ে তার পিতা। চন্দ্রাবতীর ভেঙে পড়া দেখে সাহিত্য চর্চায় অনুপ্রেরণা দেয় সে। চন্দ্রাবতী শিব পূজা ও রামায়ণ লেখায় মনোযোগী হয়। সীতার বারোমাসী লিখবে সে। চন্দ্রাবতী মনোযোগী হয় সাহিত্যচর্চায়; শিব ধ্যানে হয় মগ্ন। এই হলো নয়ান চাঁদ ঘোষের ‘চন্দ্রাবতী’।

নয়ান চাঁদ ঘোষের ‘চন্দ্রাবতী’কে খানিক যোজন-বিয়োজনে ‘গীতি চন্দ্রাবতী’ নামে নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্কের নির্দেশনায় মঞ্চে এনেছে সংস্কার নাট্যদল। নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্কের নির্দেশনার একটি বিশেষত্ব লক্ষ করা যায়, আর তা হলো সংগীত। সংগীতপ্রিয় এই মানুষটি দর্শকের হূদয় ছুঁয়ে যান সুর ও সংগীত দিয়ে। ‘গীতি চন্দ্রাবতী’ নাট্যেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এ নাটকের সুর ছুঁয়ে গেছে দর্শকের মন। কিন্তু নির্দেশক যখন নাম পরিবর্তন এবং গল্পের খানিক পরিবর্তনের দায়িত্ব নিয়েই নিয়েছেন, তখন আরো একটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। সেটি হলো এ গল্প কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয় দর্শকমনে। গল্প বয়ানে নয়ান চাঁদ ঘোষ আসমানীর পরিবার বা জয়ানন্দের সঙ্গে বিয়ের পরে জয়নাল ও আসমানীর দাম্পত্য জীবনের কোনো ছবি আঁকেননি। সেই ছবি কিন্তু দর্শকের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করে। আর নাটকের জিজ্ঞাসু দর্শক হিসেবে সেটি আরো বড়ো হয় যখন জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীর কাছে ফিরে আসে তিন বছর পরে। কী এক বেদনার ভার সহ্য করতে না পেরে জয়ানন্দ আত্মাহুতি দিল নদীর জলে! সে বেদনার চিত্র দর্শকের সামনে না আনলে যে জয়ানন্দের বিয়োগগাথা পূর্ণ হয় না সেটি অনুভূত হয় হাড়ে হাড়ে। এক্ষেত্রে নির্দেশকের একটি ব্যাখ্যা থাকতেই পারে যে এটি তো জয়ানন্দের বিয়োগগাথা নয়; চন্দ্রাবতীর বিয়োগগাথা। সেক্ষেত্রেও মনে হয় যে চন্দ্রাবতীর একপেশে কাহিনি নাট্যকার দর্শকের সামনে তুলে ধরলেন। চন্দ্রাবতী তার পুরোনো প্রেমিক জয়ানন্দকে হারানোর ব্যথায় কাতর হলো ঠিকই কিন্তু দর্শক সে ব্যথার সমব্যথী হতে পারল না।  এবার নাট্যের অভিনয় প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে। গীতি নাট্যে গান করাটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে সুরের খেলায় নির্দেশক সিদ্ধহস্ত কিন্তু জয়ানন্দ যখন সেই গানগুলো ধরছে তখন মনে হচ্ছে স্বর খানিক নিচে আবার চন্দ্রাবতী খানিক চড়া গলায় গান ধরছেন। প্রথম দু-একটা গানে এমনটা হলেও অবশ্য পরে ঠিক হয়ে যায়। তবে অভিনয়ে জয়ানন্দ মানে বাপ্পী সাইফকে কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে অতি আবেগী। বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যে। অতি অভিনয়ও কখনো কখনো অভিনয় নষ্টের কারণ হয়। সারা ঘর মুছে এসে দরজার সামনে খানিক কাদা করে রাখার মতো হয়ে গেল। আর সংস্কার নাট্যদলের অতিথী অভিনয়শিল্পী নাট্যকেন্দ্রের মনামী ইসলাম কনক বেশ ভালো করেছেন কিন্তু আঙ্গিক অভিনয়ে তার আরো বেশি পরিচ্ছন্নতা দরকার বলে মনে হয়েছে। তবে আসমানী চরিত্রে ফাতেমা তুজ জোহরা ইভার অভিনয় খুব সাবলীল মনে হয়েছে। গানের কোরোস টিম অত্যন্ত ভালো ছিল। গান আর অভিনয়ে ‘গীতি চন্দ্রাবতী’ দর্শকহূদয়ে আরো মুগ্ধতা ছড়াবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। নাটকের পোশাক, আলো ও কোরিওগ্রাফি বেশ চমত্কার হয়েছে। সকলের প্রচেষ্টায় প্রযোজনাটি আরো মঞ্চ সফল হয়ে উঠবে আগামী প্রদর্শনীগুলোতে।