গত ২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে বরিশালের অতিপরিচিত নাট্যদল শব্দাবলী আয়োজিত শব্দাবলী নাট্য উত্সব-২০১৯। নিজেদের নাটক বৈশাখিনী প্রদর্শন ছাড়াও এবারের উত্সবে ঠাঁই পেয়েছিল ঢাকার পালাকার, নেপালের আদি ইত্যাদি এবং ভারতের নটমন। ভারতের নটমন নিয়ে এসেছিল তাদের দুটি নাট্য নির্মাণ উইলিয়ম শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ আশ্যিত হিন্দি নাটক ‘ম্যাক্কোম্যান, দ্য পাওয়ার প্লে’ এবং জয়াশিস ঘোষের ডার্ক চকোলেট আশ্রিত বাংলা নাটক ‘মনকইন্যার ব্রত’। দুটি নাটকেরই নাট্যকার এবং নির্দেশক ছিলেন তমাল সেন। প্রতিটি নাটকেরই ছিল দুটি করে প্রদর্শনী, বিকেল ৫টায় আর সন্ধ্যা ৭টায়। ২৮ ডিসেম্বর ছিল ম্যাক্কোম্যান, দ্য পাওয়ার প্লে-এর দুটি প্রদর্শনী, আর ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনকইন্যার ব্রত-এর দুটি প্রদর্শনী।
ম্যাক্কোম্যান, দ্য পাওয়ার প্লে নির্মাণটি প্রাচীন ভারতীয় লোকনাট্য ‘পান্ডবাণী’র আঙ্গিকে নির্মিত। পান্ডবাণী লোকনাট্যে কথক মহাভারতের গাঁথাগুলো কথায়, গানে আর অভিনয়ের মাধ্যমে নিবেদন করেন। এই নাট্যেও কথক কথায়, সুরে আর অভিনয়ের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন উইলিয়ম শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ। নাটককার তথা নির্দেশক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সঙ্গে বর্ণনাত্মক ঢঙে গড়েছেন এই নাট্যের চলন, সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন তার নিজস্ব ব্যখ্যা। শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের চরিত্রাবলীর আগমনের কারণ তারা কে ইত্যাদি, যা সামগ্রিকতায় নির্মাণ করে ম্যাকবেথের চরিত্র। তার ভাষ্যে ম্যাকবেথ আসলে একটি অসুখ যার বীজ আমাদের সকলের মস্তিস্কেই আছে, কেবলমাত্র প্রতিরোধই এর একমাত্র নিরাময়ের উপায়। এক্ষেত্রে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন প্রাচীন ইংরেজি আপ্তবাক্যটি-prevention is better than cure. আর এখানেই শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক, দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে সার্বজনীন। কথকের ভূমিকায় অভিনেত্রী পূবালী সেন অনবদ্য। তিনি এই ভাষ্যের এবং নাট্য আঙ্গিকের সঙ্গে মিশিয়েছেন নিজেকে অত্যন্ত নিপূনভাবে। একদিকে যেমন তিনি দিয়েছেন বর্ণনা, ব্যাখ্যা, অন্যদিকে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রতিটি চরিত্রের। একাধারে তিনি লেডি ম্যাকবেথ হয়ে রাজা ডানকানকে হত্যা করবার জন্য প্ররোচিত করছেন ম্যাকবেথকে, অপরদিকে নিজেই ম্যাকবেথ হয়ে হত্যা করছেন রাজা ডানকানকে। প্রতিটি চরিত্র নির্মাণে তার আত্মপ্রয়োগ বিশ্বাস্য করে তোলে এই নাট্য প্রয়াসকে। সংগীত এই নাট্যের এক স্তম্ভ আর তার প্রকাশ ঘটেছে পূবালী সেনের সুরেলা কণ্ঠমাধুর্যে। খুবই সামান্য, কিন্তু অর্থবহ এ নির্মাণের মঞ্চাভরণ। পেছনে মহাকালের স্বরূপ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে three witches, আর সামনে লেডি ম্যাকবেথের হাত ধোয়ার পাত্র, ছড়িয়ে থাকে কিছু মুখোশ। আলোর প্রয়োগও যথাযথ মুহূর্ত নির্মাণে ব্যাঙ্গময়। এ নাট্যের দীর্ঘজীবন এ অস্থির সময়ে ভীষণই জরুরি।
নটমনের দ্বিতীয় নিবেদন ছিল কবি জয়াশিস ঘোষের ডার্ক চকোলেট অনুসরণে মনকইন্যার ব্রত। বাংলার ঘরোয়া ব্রতকথার আঙ্গিকে নাট্যকার তথা নির্দেশক তমাল সেন বর্ণনাত্মক ঢঙে বিশ্ব চকোলেট নির্মাণ দুনিয়ায় কিভাবে বিক্রি হয়ে যায় গরিব দেশের বাচ্চাদের শৈশব তার বিবরণী দিয়েছেন। আফ্রিকার মালি নামক এক গরিব দেশের গরিব পরিবারের পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে অ্যালি বিক্রি হয়ে যায় মাত্র আশি ডলারের বিনিময়ে। তার শৈসব আক্রান্ত হতে থাকে প্রতিনিয়ত কোনো এক চকোলেটের বীজ উত্পাদনকারী বাগিচায়, সেই মর্মস্পর্শী কাহিনিই এই নাটকের মূলকথা। চুরি হওয়া শৈশব, বাজার, অর্থনীতি, সমাজে অবস্থান, রাজনীতি বর্ণনা হতে থাকে অভিনেত্রী পূবালী সেনের ব্রতকথায়। এ নাট্যে দেখা গেল তার অভিনয়ের আরেক ধরন, যা তিনি অত্যন্ত নিপূণভাবে সদমননে বয়ান করেছেন। সামান্য মঞ্চাভরণ ও আলোক এ নাট্যের সম্পদ। নাটকের শেষে দর্শকদের চোখের কোণ ভিজে ওঠে। এমনই হয় যে নাট্যের শেষে প্রথাগত করতালি শোনা যায় না।