আবার উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য

মো. রাশেদ আহমেদ

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের  সবচেয়ে ক্ষুরধার  আলোচিত ঘটনা ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা জেনারেল কাশেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সহিংসতা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন্ পথে এগুচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি? কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগামী মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যত্ কোথায়?

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনি আধিপত্য বিস্তার শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই যা এখন পর্যন্ত বলবান। এ দীর্ঘ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত হয়েছে অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং রাজনীতিক অস্থিরতা। পরাশক্তিদের রক্তচক্ষু হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে লাখ লাখ নিরীহ জনগণকে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইরাক হামলা যার মধ্যে অন্যতম। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী সংকট নিয়ে বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। দখলদার ইসরাইল রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্টে বিভিন্ন এলাকা (গোলান মালভূমি, গাজা, সিনাই উপদ্বীপ, পূর্ব জেরুজালেম) দখল করে আজ তারা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,বারবার যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার ফল হয়েছে উলটো। বরং এ দীর্ঘ পরিক্রমায় বেড়েছে যুদ্ধের রাজনীতি, সহিংসতা ও প্রতিহিংসা এবং সৃষ্টি হয়েছে আইএসের মতো নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠন।

ইরান ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর পারস্য উপসাগরীয় থেকে গোটা মধ্যপ্রাচ্য এলাকা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ফলে দিন দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। অপরদিকে ইরান সামরিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাশিয়ার সহযোগিতায় ২০০৯ সালে পরীক্ষামূলক ‘পরমাণু প্লান্ট’ কাজ শুরু করে। এর ফলে একাধিকবার আন্তর্জাতিক অবরোধের মুখোমুখি হয় দেশটি। সর্বশেষ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে পরমাণু চুক্তি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় দেশটি। অবরোধও অনেকটা শিথিল করা হয় ইরানের ওপর থেকে। এর ফলে সম্পর্কটা কিছুটা উন্নতি হয় ওবামার শাসন আমলে। কিন্তু সবকিছুর জলে ঘি দিয়ে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি বাতিল করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ে আবার নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয় যা নতুন মাত্রা লাভ করে ইরানের জেনারেল কাশেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে চরম যুদ্ধ উত্তেজনা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যার মূল কারণ সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড ইস্যু। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে নিজ দেশের জনগণের কাছে ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। এমন কি ইসরাইল ছাড়া মিত্র কোনো রাষ্ট্রের সমর্থন আদায় করতেও ব্যর্থ। যা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অদূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করে। অপরদিকে ইরান এই হত্যাকাণ্ডের জন্য চরম প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীর নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে এবং যেকোনো মূল্যে ইরান এর কঠিন প্রতিশোধ নিবে। এছাড়া ইরান সমর্থিত  বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী (হিজবুল্লাহ, কুর্দিস, মিলিটিশিয়ারী, হুতি, হামাস) সংগঠন কঠিন বদলা নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—ইরাক সরকার বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের আইন পার্লামেন্টে পাশ করছে এবং জার্মানি তার নিজ দেশে সেনা প্রত্যাহার শুরু করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরান পরমাণু চুক্তি মানবে না বলে পরিষ্কার করেছে। এদিকে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ইরাকে মার্কিন দুইটি ঘাটিতে হামলা করে ৮০ জন মার্কিন সেনা নিহত ও ২০০ জন আহত হয়েছে বলে ইরানের নািউজ সংস্থা দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার লক্ষ্যে আরো ৩ হাজার অধিক সেনা মোতায়েন করছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছে, জেনারেল কাশেমী হত্যাকাণ্ডের ফলে দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে এবং বর্তমান চলমান সংকট আরো বেশি ঘনীভূত  হলো। সুতরাং আগামী দিনে ইরানের কঠিন সময় এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন্ দিকে মোড় নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া