মাহফুজা অনন্যা
একটি মেয়ের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, জীবনযাপন সবই নির্ভর করে সমাজের গঠন, কাঠামো ও প্রকৃতির ওপর। এ সমাজ নিয়ন্ত্রণের মূলে যারা রয়েছেন, তারা নিজেদের প্রাধান্য দিয়েই সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। নারীরা শিক্ষা লাভ করছেন, কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছেন, আয়-রোজগার করছেন—এসব যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে, ঘরে-বাইরে আজো নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন। নারী নির্যাতন ও তার প্রতিকারের চেষ্টা, নারীর সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে ভাষণ বা অঙ্গীকারের কমতি না থাকলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। হাতেগোনা কয়েকজন নারীর কথা বাদ দিলে গরিষ্ঠসংখ্যক নারী যে অন্ধকারে ছিলেন এখনো তাদের জীবন থেকে সে আঁধার যায়নি মুছে!
অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেই নারীর আর কোনো সমস্যা থাকবে না বলে একটি ধারণা এখন চালু হচ্ছে। কিন্তু এই ধারণাও শত ভাগ সঠিক নয়। চাকরিজীবী নারীরা সবাই খুব সুখে-শান্তিতে সংসারজীবন কাটাচ্ছেন বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। নারীকে পুরুষের চেয়ে হীনবল ভাববার মানসিকতা থেকেই কতগুলো সামাজিক ধারণা তৈরি করা হয়। নারীদের মনে করা হয় শারীরিকভাবে পুরুষের চেয়ে দুর্বল। নারীর কাজ এবং পুরুষের কাজ বলে যে বিভাজন তৈরি করা হয়, তা-ও আসলে নারীদের অধিকার বঞ্চিত রাখার একটি কূটকৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। শারীরিক ও মানসিক শ্রমসাধ্য যে কাজগুলোকে এতদিন পুরুষের কাজ বলে ধরা হতো, সে কাজগুলোও এখন নারীরা করছে সমান সক্ষমতা ও দক্ষতার সঙ্গে। বিমান চালনা কিংবা পাহাড় চূড়ায় ওঠা—কোনোটাতেই মেয়েরা পিছিয়ে নেই। তাই সব কাজ নারীর নয় বলে এখন আর মেয়েদের পেছনে ঠেলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আজ এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক অর্থহীন।
পৃথিবীতে কোনো সৃষ্টিই হাসি, উপেক্ষা আর অমর্যাদার হতে পারে না! অথচ একদিন উন্নতির শিখরে ওঠা সম্ভাবনাময় নারীটিও চরম হতাশা, ক্ষোভ, অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন—এমন নজির বহু আছে। কখনো তিনি শিক্ষক, কখনো সাহিত্যকর্মী, কখনো ঘরের বউ বা মেয়ে। আত্মহত্যা করলে সবাই ধিক্কার দেন, ছিঃ একজন শিক্ষিত মেয়ে এত দুর্বল! অথচ বেঁচে থাকতে এ সমাজ তার সমস্যার কোনো সমাধান দেয় না। যে সমাজ কারো বিপদে এগিয়ে আসে না, সেই সমাজই আজীবন দৃষ্টির আড়ালে থেকে মানুষকে অদৃশ্য ভূতের মতো ভয় দেখিয়ে চলে! এখনো কোনো নারী যৌতুক নামের কুপ্রথার বলি হলেও সবাই মেনে নেন, কিছুদিন পরেই ভুলে যান। কিন্তু যিনি ঘাতক, যার বা যাদের জন্য মেয়েটি নিজের জীবন বিসর্জন দেয়, তারা বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ান। যার কারণে মেয়েটি বেঁচে থাকতে পারেনি, কোমল মনটাকে যে খুনি খুন করেছেন, তিনি দিব্যি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন সমাজের আশ্রয়ে। সমাজের চোখ তাকে দোষী হিসেবে দেখে না।
নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেছেন ‘পুরুষদের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে, তাঁহাদের জীবনের লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহা’। কিন্তু সমাজ তা মানতে নারাজ। সমাজ চায় নারী সবসময়ই আশ্রিত থাকবে পুরুষের কাছে একটি উপভোগ্য বস্তু হিসেবে।
সাম্যবাদ সাম্যের কথা বলে। মানবতাবাদ মানুষের কথা। আর বর্ণবাদের কাজ হচ্ছে চিত্কার করে চিরকাল একটি বর্ণের কথা বলা। কিন্তু কাউকে তার মানবিক গুণের বদলে চেহারার মাপকাঠিতে বিচার করা অন্যায় ও অশিক্ষা। সেই ধারাবাহিক লজ্জার ইতিহাসে আত্মগোপন করে আছে অসংখ্য নাম এবং অসংখ্য কালো মেয়েদের যন্ত্রণা। মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ ‘কালো’ এই শব্দ মিসাইলের মতো কাজ করে। এই একটি শব্দ ছুড়ে দিলেই একটি মেয়ে কেমন কুঁকড়ে যায়, অসম্মানিত বোধ করেন। অসহায় হয়ে পড়েন। আসলে গায়ের রং দিয়ে যারা মানুষকে অপমান করেন তাদেরই লজ্জা পাওয়া উচিত। কিন্তু একটা উল্টো পিঠকেই আজীবন মানুষ সঙ্গ দিয়ে এসেছে সমাজে। যে মধ্যযুগীয় ভ্রান্ত কথাগুলো অনেক আগেই মিটে যাওয়ার কথা, সেগুলোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আজকের সমাজের দেওয়ালজুড়ে, বন্ধ দুয়ারে এবং প্রকাশ্যেও।
মেয়েদের জীবনে যে সমস্যাগুলো আছে তা মূলত পুরুষদের সৃষ্টি, সমাজেরই সৃষ্টি, পরিবারেরই সৃষ্টি। তাই এ সমস্যা সমাধানেও এগিয়ে আসতে হবে পুরুষকে, সমাজকে, পরিবারকে। নারীর অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি একা নারীর নয়। নারীর প্রতি সব পুরুষ যতদিন সংবেদনশীল হয়ে না উঠবে, ততদিন নারী স্বাধীনতার বিষয়টি অধরাই থেকে যাবে।
n লেখক :কবি ও শিক্ষক