এবার মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা

ইরাকে অবস্থিত দু’টি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ২২টি ব্যালেস্টিক মিসাইল হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরবিল ও আল-আসাদ বিমান ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা হয়েছে। ইরান থেকেই মিসাইলগুলো নিক্ষেপ করা হয়েছে। তেহরান ৮০ মার্কিন সেনা হত্যার দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায়নি। ইরানের খামেনি হামলাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের গালে চড়’ বলে মন্তব্য করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘সব ঠিক আছে’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ভার বহন করতে পারবে না। এদিকে পারস্য উপসাগরে যাত্রীবাহী বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে অনেক দেশ। খবর বিবিসি, ডেইলি মেইল ও আল-জাজিরা’র

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়েছে, দেশটির শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার বদলা হিসাবে এই হামলা করা হয়েছে। তারা এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন শহীদ সোলেইমান’। ইরানের স্থানীয় সময় রাত দেড়টার দিকে (বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে চারটা) এই হামলা শুরু হয়। ইরাকের সেনাবাহিনী বলেছে, ইরান থেকে ২২টি মিসাইল ছোঁড়া হয়েছিল। আল-আসাদ ঘাঁটিতে ১৭ টি মিসাইল হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে দু’টি বিস্ফোরিত হয়নি। তবে ইরবিলে যে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে তার সবগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে।

ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ড জানিয়েছে, সোলেইমানির হত্যাকা্লের বদলা হিসাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ইরনা নিউজ এজেন্সিতে বিবৃতিতে বাহিনীটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আমেরিকার সব সহযোগীদের আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি, যারা তাদের ঘাঁটিগুলোকে এই সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে দিয়েছে, যেখান থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী কর্মকা্ল চালানো হবে, সেটাই লক্ষ্যবস্তু করা হবে। গার্ডের একটি সূত্র বলেছে, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ১৪০টি লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করেছে।    যুক্তরাষ্ট্র ভুল পদক্ষেপ নিলে এসব জায়গায় হামলা হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সোলেইমানির হাত কেটেছে, আমরা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রে পা কেটে দেব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ টুইটারে লিখেছেন, ইরান জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারা অনুসরণ করে তার আত্মরক্ষায় যথাযথ জবাব দিয়েছে এবং জবাব দেওয়া শেষ করেছে। আমরা পরিস্থিতিকে আর উত্তপ্ত করতে চাইনা বা যুদ্ধ চাইনা, কিন্তু আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষা করবো। ইরাকের সামরিক বাহিনী বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরাকি কোনো সেনা হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে হোয়াইট হাউজ :প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে লিখেছেন, সব ঠিক আছে। তিনি সকাল হলে একটি বিবৃতি দেবেন বলেও তার ঐ টুইটে উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র স্টেফানি গ্রিশাম বলেছেন, ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার খবরের ব্যাপারে আমরা সচেতন রয়েছি। প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে অবহিত হয়েছেন এবং তিনি গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন ও জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

‘আমেরিকার মুখে চড় মেরেছি’ :ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার মাধ্যমে আমেরিকার মুখে চড় মেরেছি। ১৯৭৮ সালের কোম বিক্ষোভের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে খামেনি এ কথা বলেন। খামেনি আরো বলেন, যখন সংঘাতের প্রসঙ্গ আসে তখন এ ধরণের সামরিক হামলা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমেরিকার উপস্থিতির দিন শেষ করে দেওয়া।

‘যুদ্ধের ভার বহন করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র’

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ইরাকে মার্কিন সেনাদের টার্গেট করে চালানো বোমা হামলার ওপর কড়া নজর রাখছি। আমাদের অবশ্যই মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের অপ্রয়োজনীয় উস্কানি বন্ধ করতে হবে। ইরানকেও সহিংসতা থামাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব যুদ্ধের ভার বহন করতে পারবে না। তিনি সবাইকে প্রার্থনা করতে বলেন। ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ইরানের হামলা অনুমিত ছিল। পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া :ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা ইরানের সঙ্গে করা ছয়জাতি পারমাণবিক চুক্তি টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। ন্যাটো প্রধান স্টোলেনবার্গ ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং সকল পক্ষকে সংযত আচরণ করার আহবান জানিয়েছেন। হামলার পর ইরান ও ইরাকের আকাশসীমা দিয়ে বিমান চলাচল বন্ধ করেছে বিশ্বের অনেক দেশের বিমান কর্তৃপক্ষ। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ইসরাইলে হামলা চালালে কড়া জবাব দেওয়া হবে।

‘দীর্ঘ সংঘাতের প্রস্তুতি’ :লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ফায়াজ গার্জেস বিবিসি’কে বলেছেন, তেহরানের নেতারা এখন ইরানিদের বলতে পারবে যে, তারা সোলেইমানিকে হত্যার বদলা নিয়েছে, কিন্তু ইরানের প্রক্সিরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে। এ নিয়ে ভুল করা যাবে না: এটি ইরান ও তার প্রক্সি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শুরু মাত্র। তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এই সংঘাত ‘বাড়িয়ে’ চলেছে, কিন্তু আগামী দিনগুলো আরো ‘বেশি বিপদজনক’ হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, মানব সৃষ্ট এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসতে হবে।