দিনি দাওয়াত ও তার কর্মপন্থা

আরবি ‘দিন’ শব্দটি থেকে ‘দিনি’ শব্দটির উত্পত্তি। ‘দিন’ শব্দটি যদিও ‘ধর্ম’, ‘ধর্ম-বিশ্বাস’ ‘প্রতিদান’, ‘আদশর্’, ‘জীবন ব্যবস্থা’, ‘আইন-বিচার’ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহূত হয়; তার পরও ব্যাপকভাবে শব্দটি ‘ধর্ম’—অর্থেই অধিক পরিচিত ও ব্যবহূত হয়ে আসছে এবং সর্বসাধারণের কাছে অধিক বোধগম্য। ধর্ম থেকে ‘ধর্মীয়’-এর অনুরূপ ‘দিন’-থেকে ‘দিনি’ অর্থাত্ ‘ধর্মীয়’।      

দাওয়াত: ‘দাওয়াত’ আরবি শব্দটির অর্থ হচ্ছে, ডাক, আহ্বান ও প্রচার। ‘দাওয়াত’-এর কথা বলতে গেলে অনিবার্য প্রশ্ন দাঁড়ায় কীসের দাওয়াত? কেন এই দাওয়াত? তার জবাবে বলা হবে, ধর্মের প্রতি দাওয়াত ও আহ্বান। কেন এই দাওয়াত? তার জবাব হচ্ছে, ‘তাবলিগ’-এর প্রয়োজনে দাওয়াত বা তাবলিগের দায়িত্ব পালন কল্পে দাওয়াত তথা প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে ধর্মের প্রতি বা ধর্ম পালনের প্রতি আহ্বান। এর মানে হচ্ছে, প্রচার, ঘোষণা বা পৌঁছে দেওয়া, ‘দিনি দাওয়াত’ মানে ধর্মের বাণী প্রচার করা বা পৌঁছে দেওয়া। সুতরাং সহজবোধ্যভাবে আমরা বলতে পারি, ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’ মানে ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং ইসলামের বাণী-পয়গাম সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া, ছড়িয়ে দেওয়া।

দাওয়াত কার জন্য?

আরেকটি অনিবার্য প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মের দাওয়াত কাকে দেওয়া হবে? বাস্তবতার নিরিখে তার জবাব হচ্ছে, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিষেশে সবার প্রতি ধর্মের আহ্বান পৌঁছে দিতে হবে। অমুসলিমদের প্রতি দাওয়াত দিতে হবে, মূলধর্ম গ্রহণের তথা ঈমান গ্রহণের এবং মুসলিমদের প্রতি দাওয়াত হবে, গৃহীত ধর্ম ও ঈমানের দাবি অনুযায়ী নেক আমল করার এবং তা শিক্ষা-দীক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার। পৃথিবীতে যদি এমন কোনো স্থান পাওয়া যায়, যার অধিবাসীদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বোঝা যায় যে, ‘ইসলাম’ ধর্ম সম্পর্কে তাদের জানা নেই। তেমন ক্ষেত্রে বা স্থানে, সব মুসলমানের জন্য ফরজ তারা এমন কিছুসংখ্যক মুসলমানকে তাদের কাছে পাঠাবে যারা তাদেরকে ‘ইসলাম’-এর দাওয়াত দিয়ে মুসলমান বানাবে এবং তারপর তাদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান ও আবশ্যকীয় বিষয়াদি শিক্ষা দেবে। মুসলমানদের মাঝে যদি কেউ এ ফরজ আদায় না করে, তাহলে সবাই গোনাহগার হবে। আর যদি শুধু একজন মুসলমানও এ দায়িত্ব পালন করে, তা হলে সবাই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। বর্তমান সময়ে পুরো পৃথিবীর কোনো দেশেরই এমন কোনো স্থান নেই যেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো মুসলমানদের ওপর ‘ফরজ কিফায়া’ হতে পারে। তার কারণ, এ যুগে ‘ইসলাম’-এর খ্যাতি-প্রসিদ্ধি নিজেই ‘দাওয়াত’ হয়ে পুরো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বিস্তৃত, প্রসারিত হয়ে আছে। বিশ্বজগতের প্রতিটি মানুষই ‘ইসলাম’ নামে যে একটি ধর্ম আছে, তা জানে। যে কারণে বর্তমানে উক্ত ফরজ ও দায়িত্ব খোদ তাদের ওপরই বর্তায় যে, বিভিন্ন ধর্মের অনুসন্ধান করে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝে, সত্য-সঠিক ধর্মটি গ্রহণ, অনুসরণ করবে। তেমন চিন্তা ও পার্থক্যজ্ঞান মহান আল্লাহ্ প্রত্যেকটি মানুষকেই দান করেছেন। যে কারণে শরীয়তের বিধান হচ্ছে, ‘কোনো মানুষ যদি এমন স্থানে জন্ম নেয় যেখানে অন্য কোনো মানুষের বাস নেই; তা হলে সাবালক হওয়ার পর তারও ফরজ দায়িত্ব হবে, সে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে তার সত্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।’ (আহসানুল ফাতাওয়া: খ-৯, পৃ-১১৩)। বিজ্ঞ গ্রন্থকার অতপর লিখেছেন, ‘একইভাবে যেসব লোক জন্মগতভাবে মুসলমান, মুসলমানের গৃহে লালিত-পালিত হয়ে বড়ো হচ্ছে, সাবালক হচ্ছে; উক্ত ফরজ ও দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় যে, তারা নিজেরাই ইসলাম-এর আদেশ, নিষেধ ও বিধি-বিধান জেনে নিয়ে সে মোতাবেক আমল করবে। অন্য মুসলমানদের ওপর এটা ফরজ ও দায়িত্বভুক্ত নয় যে, তারা দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদেরকে ইসলাম-এর বিধি-বিধান শিক্ষা দেবে! কোনো ব্যক্তির ‘মুসলমান’ হওয়া মানেই হচ্ছে, “সে ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান মেনে নিয়েছে। যে-কারণে সে কোনো কাজই ‘ইসলামী আইন’ পরিপন্থি করবে না।”

 [ চলবে ]

 লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা