সুরা বাকারার ১২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দোয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন—‘হে আমাদের রব! তাদের মধ্যে একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাদেরকে আপনার কিতাবের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শোনাবেন এবং কিতাবের জ্ঞান শিক্ষা দেবেন, আর শিক্ষা দেবেন হিকমত ও প্রজ্ঞা এবং তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করবেন।’ কোরআনের এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—জগতে রাসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য চারটি—১. মানুষকে কোরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা দেওয়া, ২. কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শিক্ষা দেওয়া, ৩. হিকমত তথা সুন্নাহর জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া এবং ৪. মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। রাসুল (স) নবুওয়াতি যিন্দেগীর ২৩ বছর মৌলিকভাবে এই চারটি দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। এক্ষেত্রে রাসুলে পাকের (স) বড়ো যে বৈশিষ্ট্য ছিল—নম্রতা ও বিনয় প্রদর্শন করা। এ ব্যাপারে কোরআনে কারীমে এরশাদ হয়েছে—‘আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই আপনি মানুষের প্রতি সদয় হয়েছেন। আর আপনি যদি রাগী মেজাজ এবং পাষাণ হূদয়ের হতেন তাহলে আপনার চারপাশের মানুষরা আপনার দিকে ছুটে আসত না।’ (সুরা আল ইমরান-১৫৯)। সাহাবায়ে কেরামের বিশাল জামাত রাসুলের চারপাশে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো একত্রিত হওয়ার মূল কারণ ছিল রাসুলের সদয় ব্যবহার। তাই একজন দ্বীনের দাঈর সবচেয়ে বড়ো গুণ হতে হবে মানুষের সঙ্গে কোমল ব্যবহার করা। ধৈর্য ও সবর ছাড়া দাওয়াতের কাজ সম্ভব নয়। কথায় কথায় রাগান্বিত হওয়া যাবে না। আল্লাহপাক পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ করেন—‘হে রাসুল! আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। আপনার ধৈর্য ধারণ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই। এবং তাদের জন্য দুঃখবোধ করবেন না।’ (সুরা নাহল-১২৭)। দ্বীনের দাঈর ভাষা ও বচন ভঙ্গি কেমন হবে এব্যাপারে আল্লাহপাক কোরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন—‘হে রাসুল! আপনি মানুষকে স্বীয় প্রভুর পথে আহ্বান করুন হিকমাত তথা প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে। আর লোকদের সঙ্গে বিতর্ক করুন সর্বোত্তম পন্থায়।’ (সুরা নাহল-১২৫)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. বলেন—এই আয়াতে কারীমার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে দাওয়াত ও তাবলিগের তিনটি উপায় শিক্ষা দিয়েছেন- ১. হিকমাত তথা মযবুত দলিল-প্রমাণের আলোকে, প্রজ্ঞাজনোচিত ভঙ্গিতে অত্যন্ত পরিপক্ক ও অকাট্য বিষয়বস্তু পেশ করা, যা শুনে বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবান লোকও আল্লাহর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ২. মাওয়ায়েযে হাসানাহ অর্থাত্ মনোজ্ঞ ও হূদয়গ্রাহী উপদেশ, যাতে আল্লাহ বিমুখ পাষাণ হূদয়ও বিগলিত হয়। ৩. সর্বোত্তম পন্থায় তর্ক-বিতর্ক করা অর্থাত্ যারা হিকমাতপূর্ণ কথা গ্রহণ করে না এবং ওয়াজ-নসীহতেও কান দেয় না, বরং তর্কে লিপ্ত হতে চায় তাদের সঙ্গে শিষ্টাচার বজায় রেখে উত্কৃষ্ট পন্থায় বিতর্ক করা। অহেতুক কথাবার্তা না বলা; যার দ্বারা সমস্যার কোনো সুরাহা তো হয়ই না; বরং শুধু আলোচনা প্রলম্বিত হয়। (তাফসীরে উসমানী: ২/৬২৮-৬২৯)
লেখক :জামেয়া উবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসা (চট্টগ্রাম)-এর মহা পরিচালক ও পির সাহেব, নানুপুর