‘আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে’

পাকিস্তানের কারাগারে দীর্ঘ ২৮৮ দিন বন্দি থাকিবার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। লন্ডন ও দিল্লি হইয়া তিনি স্বাধীন দেশের মাটিতে প্রথম পা রাখেন ১০ জানুয়ারি। সেই দিন বঙ্গবন্ধুকে একঝলক দেখিতে কাতারে কাতারে মানুষ বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে জড়ো হয় তেজগাঁও বিমানবন্দরে এবং ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে। রেসকোর্সের বিশাল সেই জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়াইয়া কান্নায় ভাঙিয়া পড়েন বঙ্গবন্ধু। আনন্দ-অশ্রুর মাঝে তিনি বলেন, ‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে।’ প্রকৃত অর্থেই আমরা দেখিতে পাই, বঙ্গবন্ধু এই বদ্বীপের সবচাইতে সার্থক মানুষ। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণ করিয়াছিলেন তাহার জীবনের স্বাদ।

বঙ্গবন্ধু প্রায় সাড়ে ৯ মাস ছিলেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জগতে। পাকিস্তানের বন্দিশালায় তাহাকে সংবাদপত্র পর্যন্ত পড়িতে দেওয়া হয় নাই। তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলিয়াছেন ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর অভাবিত অবদানের কথা। জানাইয়াছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নাই যার কাছে তিনি আপিল করেন নাই শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে।’ বঙ্গবন্ধু ইস্পাতদৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘জানতাম না আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে, আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম—আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে, দুইবার মরে না।...এবং যাবার সময় বলে যাব জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।’

আমরা ইহা গভীরভাবে অনুধাবন করিতে পারি, বঙ্গবন্ধুর সমস্ত দেহমন জুড়িয়া ছিল বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ। পলিমাটির মতো নরম আদুরে ছিল তাহার হূদয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে তাহা রৌদ্রতপ্তে কঠিন হইয়া উঠিতে দ্বিধা করিত না। তিনি আমাদের শিখাইয়াছেন—কীভাবে রুখিয়া দাঁড়াইতে হয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে; হিংসা, অবিচার, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে। তিনি ঐদিনের ভাষণে আরো বলিয়াছেন, ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ করোনি। কবিগুরুর কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ।’ কিন্তু সত্যিই কি আমরা ‘মানুষ’ হইয়াছিলাম পুরোপুরি? তাহা না হইলে পাকিস্তান যাহাকে মুক্তি দিল, কবর খুঁড়িয়াও শেষাবধি ছাড়িয়া দিল বাঙালি জাতির মাঝারে, সেই বাঙালিরাই কিনা বঙ্গবন্ধুর পলিমাটির মতো নরম আদুরে কোমল হূদয়খানিকে ছিন্নভিন্ন করিল অজস্র বুলেটের ছোবলে?

মুজিববর্ষের কাউন্টডাউন শুরু হইয়াছে আজি হইতে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই দিনে বঙ্গবন্ধু বলিয়াছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়।’ কিন্তু সেই চুরি-ডাকাতি-লুটতরাজ কি এখনো প্রশমিত হইয়াছে? আমরা কি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন করিতে পারিতেছি? বঙ্গবন্ধু ঐ দিন বলিয়াছিলেন, ‘আমি জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই, সাবধান বাঙালিরা, ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই।’ মুজিববর্ষে আমাদের আমলে লইতে হইবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরিয়া আসিবার প্রথম এই অনুভূতিগুলি।