২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী একদিকে যেমন গণহত্যা চালিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালি কারাগারে। তিনি যুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। ফিরে এসেছেন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, তার স্বপ্নের বাংলাদেশে। তিনি বাংলার মানুষকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। পাকিস্তান কারাগারে তার সামনে তাকে দেখিয়ে কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু এর জন্য তিনি ভীত ছিলেন না। তিনি তাদের বলেছিলেন, ‘ইয়াহিয়া খান আমার ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন। আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। বাঙালিরা একবার মরতে জানে। তাই বলেছি, ক্ষমা চাই না। তাদের বলেছি, তোমরা মারলে ক্ষতি নাই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।’
তিনি এমনই একজন সাহসী, স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। স্বাধীন দেশে ফিরে আসার পর তিনি অনেক জায়গায় বলেছেন, আমার সহকর্মী তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল বলেছিলেন যে, আপনার এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া উচিত। পাকসেনারা যেকোনো সময় গ্রেফতার করতে পারে। আমি তাদের বলেছি, আমি এখানেই মরতে চাই। নইলে ওরা ভাববে, আমি ভীতু, পলাতক। কিন্তু আমি জানি, আমি তো মাথা নত করতে পারব না। তখন ওরা কাঁদছিল। আমি চোখের পানি দেখতে চাইনি। ওদের বলেছিলাম, তোমরা আমার নির্দেশমতো সংগ্রাম চালিয়ে যাও। মাথা নত করলে দেশ স্বাধীন হবে না। তারা আমার সামনে সেই ওয়াদা করেছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিলেন। এখন স্বাধীন দেশে ফিরে দেখি যে আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে ওরা। সংগ্রাম চালিয়ে যেতে কোনো দ্বিধা করেননি।
বঙ্গবন্ধু সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে সোজা রেসকোর্স ময়দানে চলে এসেছিলেন। তিনি জনতার সামনে যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, শুরুতেই বলেছিলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন, যারা বর্বর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের আত্মার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই।’ এটা বলতেই হবে যে আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার প্রতি জানাই সালাম। এই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, অসংখ্য বাঙালি মা-বোনের অসম্মান করেছেন, তবু আমি চাই আপনারা ভালো থাকুন। এই ‘অসম্মান’ শব্দটি তিনি নির্যাতিত নারীর প্রতি সম্মান রেখে উচ্চারণ করেছেন। অবমাননার কোনো জায়গা থেকে তিনি কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। আজকের বাংলাদেশে নির্যাতিত নারীদের যেভাবে অসম্মান করে বলা হয়—দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে...। মা-বোনের সঙ্গে এমন কোনো শব্দ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ অনবরত বলা হয়, তিরিশ লক্ষ শহিদের এবং দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। নারীদের অসম্মান করে এই জায়গাটির উচ্চারণ খুব তীব্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত শব্দ। ইজ্জতের বিনিময়ে বিশ্ব জুড়ে পুরুষরা নারীকে অবমাননা করে ওদের বিরোধী দলকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ছাড়ে। যুদ্ধকালীন বা সংগ্রামের সময়ে পৃথিবীব্যাপী এ ঘটনা ঘটে থাকে। নারী তার বিপরীতে যুদ্ধের নেপথ্যের শক্তি হিসেবে কাজ করে। যাদের পক্ষে সম্ভব হয় তারা রণক্ষেত্রে যায়। এমন অনেক উদাহরণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আছে।
তিনি তার ১০ জানুয়ারির ভাষণের এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নি।’ কবিগুরুর এই আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। বাঙালি জাতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা মানুষ, প্রাণ দিতে জানে। এমন কাজ তারা এবার করেছে যার নজির ইতিহাসে নাই।
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। এ বছর এই দিনটি থেকে তার জন্মশতবর্ষের ক্ষণ গণনা শুরু হচ্ছে। এই শ্রেষ্ঠ বাঙালির শতবর্ষ স্মরণ অনুষ্ঠান ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়ে চলবে বছরব্যাপী। এই স্মরণোত্সব আমাদের জন্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ এ কারণে যে, তার সাহস, সততা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, জীবনদর্শন—এসব যদি আমরা আত্মস্থ করতে পারি, তাহলে এটাই হবে আমাদের বঙ্গবন্ধুকে শতবর্ষে স্মরণ করার শ্রেষ্ঠ দিক।