পরমাণু শক্তি ও বিশ্বের শান্তি

বাংলায় প্রবাদ রহিয়াছে—জোর যাহার মুল্লুক তাহার। প্রাচীনকালে, ধরা যাউক প্রস্তরযুগের কথা, কেহ যদি অপরের অপেক্ষা একটুখানি উন্নত প্রস্তর-অস্ত্র তৈরি করিতে পারিত, তবে তাহার জোর বৃদ্ধি পাইত বহু গুণ। লৌহ, ব্রোঞ্জ হইতে আধুনিক যুগেরও সেই প্রাচীন নিয়ম চলিয়া আসিতেছে। যাহাদের হাতিশালে হাতি আর ঘোড়াশালে বিপুল ঘোড়া রহিয়াছে কিন্তু যুগোপযোগী কামান-গোলাবারুদ নাই—তাহা হইলে তাহাদের মুল্লুক বারুদধারীদের জোর করিয়া দখল করিতে দেখা যায়। এমনিভাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরিয়া উপনিবেশ গড়িয়া তুলিয়াছিল ইউরোপীয় বিভিন্ন শক্তি।

সুতরাং সমীকরণটি জলবত্ তরলং। তুমি আমার উপর ছড়ি কেন ঘুরাইতে পারিতেছ? কারণ, তোমার জোর আমার চাইতে অধিক। ইহা যেন সুমো পালোয়ানদের কুস্তির মতো—যাহার ভর ও পেশিশক্তি অধিক, তাহার প্রতাপও অধিক। মানুষ নাকি ক্রমশ মানবিক ও সভ্য হইয়াছে! কিন্তু সভ্যতার এই আদি নিয়ম এখনো সমগ্র বিশ্বে প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশিত। এখনো পরাশক্তিদের অঙ্গুলিহেলনে কোনো মুল্লুক দখল কিংবা দখলকৃত মুল্লুকের স্বীকৃতিদান নূতন কোনো বিষয় নহে। এমনটি অহরহ দেখা যাইতেছে পশ্চিম তীরে, গাজায়, পশ্চিম এশিয়ার কোনায় কোনায়। প্রকৃতির একটি উদাহরণ এই ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকভাবে তুলিয়া ধরিতে হয়। সম্প্রতি এএফপির একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গাছপালা বা পশুপাখির যে কোনো প্রজাতি ভিন্ন পরিবেশ হইতে আনিয়া বিস্তার ঘটাইবার সুযোগ দিলে তাহারা কালক্রমে আগ্রাসি প্রজাতিতে পরিণত হয়। স্থানীয় প্রজাতিদের জায়গা দখল করিয়া তাহাদের বিপন্ন করিয়া তুলে। একই ঘটনা ঘটিয়াছে মানুষের সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রেও। কলম্বাস ও পরবর্তী সময়ে আমেরিগোর অভিযানের পর উত্তর আমেরিকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী এক অর্থে বিলীন হইয়া গিয়াছে। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। এখনো আগ্রাসি ভিনগোত্রের মানুষের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানীয় মানবসম্প্রদায় বিলুপ্তের খাতায় নাম তুলিতেছে।

বাস্তবিক অর্থে, সকল জনপদেরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। অথচ পরাশক্তিরা নিজেদের কথিত ‘আদর্শিক বৈশিষ্ট্য’ই সকলের জন্য সমান আদর্শের মনে করে। এবং নিজেদের ভূরাজনীতি, বাণিজ্য—বিবিধ প্রয়োজনে উহা চাপাইয়া দিতে চেষ্টা করে বহুল-বৈচিত্র্যের বিভিন্ন জনপদে। সুমো পালোয়ানের মতো নিজেদের শক্তির দম্ভে পরাশক্তিরা ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। অপছন্দের কাউকে মাটির নিচে পুঁতিয়া ফেলিবার হুংকার ছাড়েন যখন-তখন। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই হুংকার গিলিয়া ফেলিতেও বাধ্য হয় পরাশক্তিরা। কারণ, যাহার প্রতি এমন হুংকার উচ্চারণ করা হইয়াছে, তাহারা খাইয়া না-খাইয়া পরমাণু-শক্তিধর হইয়াছেন। একইভাবে আমরা দেখিতে পাই, প্রতিবেশীর সহিত শক্তির ভারসাম্য রক্ষার্থে অপর একটি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলিয়াছিলেন, প্রয়োজনে ঘাস খাইয়া থাকিবে তাহার দেশ, তবুও পরমাণু শক্তি অর্জন করিতেই হইবে। প্রথম কম্পিউটার এনিয়াক আকারে ছিল কয়েকটি ঘরভর্তি বড়ো বড়ো যন্ত্রে ঠাসা। আর তাহা অপেক্ষা হাজার গুণ শক্তিশালী কম্পিউটার এখন মানুষের মুঠোমধ্যেই আঁটিয়া যায়। হয়তো ভবিষ্যতে এমন দিন আসিবে যখন পরমাণু শক্তিধর হইতে ইউরেনিয়ামের ফিউশন-কৌশল আয়ত্ত করিতে পারিবে প্রত্যেকটি জনপদ। সকলেই যদি পরমাণু-শক্তি অর্জন করে তখন কেহ আর কাহাকেও কথায় কথায় চোখ রাঙাইতে পারিবে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, তখন, ‘আমরা সবাই রাজা’। অনেকের মতে, একটি রাষ্ট্রের জন্য তাহার শান্তি ও স্থিতির স্বার্থে পরমাণু-শক্তি অর্জন করাটা অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়িয়াছে!