‘আমাদের গৌরব’ একটি নতুন আশা

দীপংকর গৌতম

একটা মরুভূমির পাশে একটা সাগর থাকে। নতুবা পরিবেশের ভারসাম্য হয় না। প্রকৃতির নিয়মেই এটা হয়। সমাজেও যতই অনাচার, শোষণ, অরাজকতা থাকুক; তার মধ্যেও স্বপ্ন দেখার কিছু বিষয় থাকে; যে কারণে শত সংকটেও মানুষ সুসময়ের অপেক্ষা করে। আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষ আছে। মানুষের সম্পদ লোপাট করার লোক যেমন আছে, আবার নিজের টাকায় মানুষের উপকারের যথাসাধ্য চেষ্টা করে, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। মানুষের সেবায় নিয়োজিত এমনই একটি সংগঠনের নাম ‘আমাদের গৌরব’। এটি  স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আমাদের গৌরবের প্রতিষ্ঠাতা এক তরুণ, নাম সাইদুল ইসলাম খন্দকার। এখন তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় শ্রম দেন অনেক তরুণ। ফলে তার কাজের ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে রাজধানী শহরের উত্তরখান এলাকায়। বড়বাগ মহল্লা থেকে কাজ শুরু করলেও এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে তার কাজ। স্বেচ্ছায় ও নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে সংগঠনটি তত্পর। রাত্রিকালে পরিবহনহীন অসুস্থ রোগীকে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারাটাই ‘আমাদের গৌরব’ সংগঠনের প্রধান কাজ। অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি মানুষের সেবা দিতে শুরু করেছে গত দুই বছর ধরে। এ কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা কেউ কেউ শ্রম দিয়ে, কেউ প্রিয় গাড়িটি দিয়ে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়োজিত থাকেন। এলাকার প্রত্যেক বাড়ির দুয়ারে তাকালে চোখ পড়বে একটি স্টিকারের দিকে। এটি আমাদের গৌরবের ফোন নম্বর এবং সেবা দেওয়া-নেওয়ার নিয়মাবলি-সংক্রান্ত স্টিকার। বড়বাগ এলাকার সব বাড়ি, বস্তি—সবখানে ঝুলছে এই স্টিকার। এই ফোনে কল করলেই সঙ্গে সঙ্গে সেবার নিশ্চয়তা মিলবে।

আমাদের গৌরবের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সাইদুল ইসলাম খন্দকার। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় দক্ষিণখানে বসে। ‘আমাদের গৌরব’-এর মতো একটি সংগঠন করার কথা কীভাবে চিন্তায় এলো জানতে চাওয়া হলে তিনি শোনান তার স্বপ্নপূরণের গল্প। তার বাসা এয়াপোর্ট-সংলগ্ন এলাকা উত্তরখানের বড়বাগ এলাকায়। ৩ হাজার ৫০০ লোক বাস করে এই এলাকায়। তিনি  একসময় দেখতেন রাত একটু বাড়লেই রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কত কষ্টকর। প্রথমে তিনি নিজের এলাকার এ চিত্র বদলানোর চিন্তা করেন।

রাত ১১টার পরে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া অনেক কষ্টের ব্যাপার। যানবাহন খুঁজতে খুঁজতেই চলে যায় কয়েক ঘণ্টা। এই পরিবহন-সংকটে হাসপাতালে নিতে নিতে অনেক রোগী মারা যায়। সব সংকট চোখে দেখে তিনি ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে এলাকার ৩০-৪০ জন তরুণকে নিয়ে গড়ে তোলেন সংগঠনটি। তাদের প্রথম শুরু হয় নিজের প্রাইভেট কার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। তারপর স্টিকার ছাপানো। স্টিকার লাগিয়ে দেন এলাকার প্রতিটি বাড়ির দরজায়। স্টিকারে লেখা থাকে ফোন নম্বরসহ বিভিন্ন নিয়ম।

প্রথমে তাদের দুটি প্রাইভেট কার ছিল। পরে রোগী বাড়লে গাড়ির চাহিদাও বাড়তে থাকে। এ সময় তারা রেন্ট-এ কারেরও সাহায্য নেন। রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম। এই এলাকার তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে থাকে। সবার মধ্যে একটা বিনয়ী ও সেবামূলক মানসিকতা তৈরি হয়। তিনি জানান, রাতে পরিবহন চালানোতে নিরাপত্তার একটা বিষয় থাকে। সেখানে পুলিশ বাহিনীর সহায়তা উল্লেখ করার মতো।

তাদের এই সেবামূলক কাজের অর্থের উেসর কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের অর্থের একমাত্র উত্স গৌরবের ফান্ড। এটা এমনো হয়, নিজের পকেটের টাকায় চলে। মাসে সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তারা কোনো এনজিওর সাহায্য বা কোনো ডোনেশন এখনো নেননি। তবে কার্যক্রমটা ছড়িয়ে দিতে চান জন থেকে জনে, সারা দেশে। তাদের রাতের এই কার্যক্রমে সহয়তা দেন কেউ কেউ। একইভাবে তারা কাজ শুরুর সব প্রক্রিয়া শুরু করেছেন পিরোজপুর জেলার গুয়ারেখায়। সেখানে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার মাধ্যম মাত্র দুটি—ট্রলার ও ইজিবাইক। সেসব জায়গায় গিয়ে ইতিমধ্যে টিম থেকে শুরু করে কাজের সব ঠিকঠাক করা হয়েছে।

 এছাড়া আমাদের গৌরবের উদ্যোগে সব জাতীয় দিবস পালন করা থেকে শুরু করে শরীরচর্চা, বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা হয় মাঝে মাঝে। এরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আন্দোলন করেন। পুরোনো ভাঙা খেলনা মেরামত করে তা গরিব শিশুদের মধ্যে বিতরণ করেন। এখানের সদস্যরা সমাজকল্যাণমুখী বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের গৌরবের সঙ্গে যুক্ত সদস্যরা খুবই স্বপ্নবান তরুণ। তাদের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন কী জানতে চাইলে বলেন, সারাদেশটাকে তারা কাজের আওতায় আনতে চান। এই স্বপ্নবান তরুণদের স্বপ্ন আকাশ স্পর্শ করুক— এই আশাই করছি।

n লেখক :সাংবাদিক