ইমরান হোসাইন
নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি হরিণঘাটা-লালদিয়া। দক্ষিণের এই অঞ্চলটি যেন প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের আঁচলে ঢাকা। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার অন্যতম এই দর্শনীয় স্থানটিতে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য। আর অকৃত্রিম বনের মাঝে ছড়িয়ে থাকা সবুজের সমারোহ। এ সৈকতে মানুষের উপস্থিতি কম বলে এখানে নানা প্রজাতির পাখির নির্বিঘ্ন বিচরণ চোখে পড়ে। সৈকতে ঘুরে বেড়ানো লাল কাঁকড়ার দলও দেখার মতো এক দৃশ্য।
বনাঞ্চলটি পাথরঘাটার সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর, পায়রা পূর্বে বিষখালী আর পশ্চিমে বলেশ্বর নদের মোহনায় গড়ে উঠেছে। কেওড়া, গরাণ, গেওয়া, ওড়া প্রভৃতি শ্বাসমূলীয় গাছ এখানকার প্রধান বৃক্ষ। দেখা মেলে হরিণ, বানর, বনবিড়াল, গুইসাপ, মেছো বাঘ, ডোরা বাঘ, সজারু, শিয়াল, শূকর, নানান প্রজাতির সরীসৃপসহ প্রায় ২০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। পাখপাখালির কলকাকলিতে মুখর চারপাশ।
সুন্দরবনের চেয়ে আকৃতিতে বড়ো প্রজাতির চিত্রল হরিণের বিচরণস্থল হওয়ায় এই বনের নামকরণ হয়েছে হরিণঘাটা। সবুজে ছাওয়া এ বনের সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করেছে লাল দিয়া, পদ্মা, লাঠিমারা পাশাপাশি সুবিশাল তিনটি সৈকত।
সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলকে ‘ইকো ট্যুরিজম’ হিসেবে গড়ে তুলতে দর্শনার্থীদের স্বচ্ছন্দে চলাচলের জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় জলবায়ু ট্রাস্টের তহবিলের আওতায় বনের ভেতর বন আর সাগরের বিশাল জলরাশি দর্শনের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছে ফুট ট্রেইল। বনের ভেতর পায়ে চলা সেতু আকৃতির এই পথ দর্শনার্থীদের নিসর্গ মায়ায় টানে। এ বনাঞ্চলটি পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয় ২০১৫ সালে।
কর্মব্যস্ত মানুষেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু বিনোদনের জন্য ছুটে আসেন লালদিয়ার সমুদ্রপাড়ে। এখানে সুন্দরবনের আমেজ ও সমুদ্র পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। কিন্তু অনুন্নত রাস্তাঘাটে চলাচলে অনেকটাই কষ্ট করতে হয় পর্যটকদের। প্রশাসনিক কোনো নিরাপত্তা পান না পর্যটকরা। নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থাও। হরিণঘাটা থেকে লালদিয়া পর্যন্ত পায়ে হাঁটা সেতুটি এখনো অসম্পূর্ণ। যে কারণে পর্যটকদের ঝুঁকি নিয়ে যেতে হচ্ছে মাছ শিকারের ছোটো-ছোটো নৌকায়। লালদিয়া সেতু সম্পন্ন করার পাশাপাশি এখানে একটি মিনি চিড়িয়াখানা এবং স্থানে স্থানে বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য রাখা যেতে পারে।
হরিণঘাটায় আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো বনের ভেতর সর্পিলাকারে ছড়িয়ে থাকা ছোটো-বড়ো মিলিয়ে ১০-১২টি খাল। জোয়ারের সময় খালগুলো পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। তবে এ বনাঞ্চল থেকে প্রতিদিনই উজাড় হচ্ছে কেওড়া, সুন্দরী, বাইনসহ নানা প্রজাতির গাছ। এখনই চুরি বন্ধ করতে না পারলে হুমকিতে পড়বে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য। এই সাগরপাড়ে দর্শনার্থীরা ভিড় দেখে সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা মানুষেরা নানা সম্ভাবনার আশা খুঁজতে শুরু করেছেন। এই পর্যটনকেন্দ্রটিকে ঘিরে এলাকাবাসী বুনছেন স্বপ্নের জাল। তাই উন্নত রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা ও বিদ্যুত্ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিকল্প নেই। আর সেটা করা গেলে দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের মতো হরিণঘাটা ও লালদিয়ার চরটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে পর্যটকদের কাছে।
বরগুনা